ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের এক অনন্য ও বিদুষী নারী ছিলেন আতিকা বিনতে জায়েদ (রা.)। রূপ an্দ সৌন্দর্য, ধার্মিকতা এবং প্রজ্ঞার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যবোধ ও বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ছিল বিরল। মক্কার কোরাইশ বংশের বনু আদি গোত্রে আনুমানিক ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। ইসলামের শুরুর দিকেই তিনি ঈমান গ্রহণ করেন এবং মদিনায় হিজরতের গৌরব অর্জন করেন। তিনি শুধু একজন ধর্মপ্রাণ নারী ছিলেন না, বরং তৎকালীন আরবে একজন প্রখ্যাত কবি হিসেবেও তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল।
আতিকার পারিবারিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর পিতা জায়েদ ইবনে আমর জাহেলি যুগেও পৌত্তলিকতা বর্জন করে নবী ইব্রাহিমের বিশুদ্ধ একত্ববাদী বা হানিফ ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। আতিকার ভাই সাইদ ইবনে জায়েদ (রা.) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন এবং খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই।
ইসলামি ইতিহাসে আতিকা বিনতে জায়েদ (রা.) 'জাওজাতুশ শুহাদা' বা 'শহীদদের স্ত্রী' হিসেবে পরিচিত। তাঁর জীবনের পাঁচটি বিবাহের প্রতিটিই ছিল উল্লেখযোগ্য, কারণ তাঁর পাঁচজন স্বামীই ছিলেন শীর্ষস্থানীয় সাহাবি এবং প্রত্যেকেই শাহাদতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তাঁর প্রথম বিবাহ হয় খলিফা ওমরের বড় ভাই জায়েদ ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে, যিনি ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। এরপর তিনি বিবাহ করেন আবু বকর সিদ্দিকের পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকরকে, যিনি ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তায়েফ অবরোধকালে গুরুতর আহত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তৃতীয়ত, তিনি দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের স্ত্রী হন; তাঁদের এক পুত্রসন্তান ছিল যার নাম ইয়াজ। ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ফজরের নামাজের সময় আততায়ীর ছুরিকাঘাতে খলিফা ওমর (রা.) শহীদ হলে আতিকা পেছনের কাতারে নামাজে উপস্থিত ছিলেন। এর পর তিনি বীর সাহাবি জুবাইর ইবনুল আওয়ামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে উটের যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর সর্বশেষ বিবাহ হয় নবীজীর দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলির সঙ্গে, যিনি কারবালার প্রান্তরে শহীদ হন। তবে কারবালা ট্র্যাজেডির কয়েক বছর আগে ৬৭২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মদিনায় আতিকা (রা.) ইন্তেকাল করেন। একের পর এক স্বামীর শাহাদতের কারণে মদিনাবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, যে ব্যক্তি শহীদ হতে চায় সে যেন আতিকাকে বিবাহ করে।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে আতিকা (রা.) ছিলেন একজন দক্ষ 'শায়িরাহ' বা স্বভাবকবি। বিশেষ করে প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকগাথা বা 'রিসা' রচনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত এবং তাঁর স্বামী আবদুল্লাহ, ওমর ও জুবাইর (রা.)-এর শাহাদতের বেদনায় তিনি যে হৃদয়স্পর্শী কবিতাগুলো লিখেছিলেন, তা আজও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত।
গভীর ইবাদতগুজার এবং মসজিদপ্রেমী আতিকার জীবনে একটি বিশেষ শর্ত ছিল। তিনি বিয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর স্পষ্ট জানিয়ে দিতেন যে, মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করার ক্ষেত্রে তাঁকে বাধা দেওয়া যাবে না। খলিফা ওমর এবং জুবাইর (রা.) উভয়েই তাঁর এই স্বাধীন ইচ্ছা ও শর্ত সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। পাঁচজন বীর শহীদের জীবনসঙ্গিনী হয়ে তিনি যেমন অসীম ধৈর্য দেখিয়েছেন, তেমনি বিধবা নারীদের সম্মানজনক পুনর্বিবাহ ও সামাজিক প্রতিকূলতা জয় করে জীবন গড়ার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।




