শরীরচর্চার উপকারিতা নিয়ে নতুন একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটি দেখিয়েছে যে, অত্যন্ত তীব্রতার ব্যায়াম অল্প সময়েই শরীরের ভেতরে ব্যাপক আণবিক ও বিপাকীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। গবেষণাটি Cell Reports Medicine সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। সেখানে তরুণ ও সুস্থ পুরুষদের ওপর স্প্রিন্ট ইন্টারভ্যাল ব্যায়াম এবং মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তুলনা করা হয়।

ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রশ্ন উঠে, কম সময়ে বেশি জোরে ব্যায়াম করলে কি একই ফল পাওয়া যায়? গবেষকেরা দেখেছেন, স্প্রিন্টের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার কয়েকটি সংক্ষিপ্ত ধাপ সম্পন্ন করেন। এর পর রক্তে বিপুল সংখ্যক বিপাকীয় উপাদানের পরিবর্তন ঘটে। একই সঙ্গে পেশি, চর্বি ও অন্যান্য টিস্যুর মধ্যে যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রোটিনের মাত্রাও বদলে যায়। বিশ্লেষণে ব্যায়ামের পর ২০৩টি বিপাকীয় উপাদানে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখা গেছে। মাঝারি তীব্রতার ব্যায়ামেও পরিবর্তন হয়েছে, তবে তার ধরন ও সময়ের সঙ্গে তার মাত্রা ছিল আলাদা।

এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, ব্যায়ামের তীব্রতা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে দূরবর্তী যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দীর্ঘক্ষণ ব্যায়ামের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। গবেষণাটি মূলত শরীরচর্চার পর প্রোটিন ও বিপাকীয় উপাদানের তাৎক্ষণিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে হৃদরোগ বা টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তা বুঝতে আরও বড় ও দীর্ঘ সময়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

ব্যায়াম করলে শরীরে শুধু পেশি শক্ত হয় বা ক্যালরি খরচ হয়—এমন নয়। পেশি সক্রিয় হলে যকৃত, রক্তনালি ও অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে দ্রুত সংকেত বিনিময় শুরু হয়। বিভিন্ন প্রোটিন ও বিপাকীয় উপাদান রক্তে পরিবর্তিত হয়ে শরীরকে শক্তির চাহিদা, জ্বালানির ব্যবহারের ধরন এবং মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য দেয়। এই সামগ্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র ও বিপাকের স্বাস্থ্য গভীরভাবে জড়িত, যাকে কার্ডিওমেটাবলিক স্বাস্থ্য বলা হয়।

গবেষকদের মতে, শুধু সময় নয়—তীব্রতাও এই ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু স্প্রিন্ট বা দ্রুতগতির ব্যায়ামকে নিয়মিত রুটিনের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, পুরো শরীরচর্চার বিকল্প হিসেবে নয়। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তার উপকারিতা নিয়ে আগের গবেষণায়ও যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এমনকি অল্প সময়ের দৈনন্দিন সক্রিয়তাও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের তুলনায় অনেক বেশি উপকারী হতে পারে।

সময় কম থাকলে ব্যায়ামকে আরও কার্যকরভাবে সাজানো যায়। নিয়মিত হাঁটার গতি কিছুটা বাড়ানো, সাইক্লিংয়ের মধ্যে অল্প সময় বেশি জোরে চালানো, সিঁড়ি ওঠা বা দৈনন্দিন কাজেও অতিরিক্ত গতি যোগ করা সম্ভব। তবে সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করা ব্যক্তি বা যাদের শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো দ্রুত ওয়ার্কআউট অনুসরণ করা ঠিক নয়। নিরাপদ পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে শরীরকে প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম হলো সেটিই, যা নিরাপদভাবে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া যায়। অনেকেই ব্যায়ামকে ‘শাস্তি’ হিসেবে দেখেন—ওজন বেড়েছে বলে হঠাৎ প্রতিদিন দুই ঘণ্টার জিমের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ক্লান্তি, সময়ের অভাব বা একঘেয়েমির কারণে কয়েক দিন পর সেই রুটিন ভেঙে পড়ে। বাস্তবে কোনো দিন দীর্ঘ হাঁটা, কোনো দিন দ্রুতগতির ছোট বিরতি, আবার কোনো দিন সাইক্লিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম—রুটিনে বৈচিত্র্য থাকলে শরীরচর্চা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য কোনো জাদুকরি শর্টকাট নেই। নতুন গবেষণা মনে করিয়ে দেয় যে, ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সময়ের পরিমাণের পাশাপাশি তীব্রতাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্প সময়ের বেশি তীব্রতার শরীরচর্চা দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তবে সুস্থ থাকার একমাত্র পথ কোনো নির্দিষ্ট ব্যায়াম নয়। নিয়মিত হাঁটা বা অন্য শারীরিক সক্রিয়তা, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার—সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয় কে সবচেয়ে দ্রুত দৌড়ালেন, বরং কে নিজের সক্ষমতা বুঝে নিয়মিত ও নিরাপদে নড়াচড়া করতে পারছেন।

তথ্যসূত্র: Medical News Today; ছবি: Pexels.com