মানুষ কেবল ভালো গুণের সমষ্টি নয়। আমাদের আচরণ ও সিদ্ধান্তের আড়ালে লুকিয়ে থাকে কিছু অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, যা অজান্তেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। কখনো আমরা অন্যের অপমানে আনন্দ অনুভব করি, কখনো বিপদে পড়া কাউকে দোষারোপ করি, আবার কখনো ভিড়ের মধ্যে নিজের দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলি। এই আচরণগুলোর পেছনের কারণ বুঝতে ‘ডার্ক সাইকোলজি’ বা অন্ধকার মনোবিজ্ঞানের পাঁচটি ধারণা সম্পর্কে জানা জরুরি।

প্রথমেই আসে বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট। এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে আশপাশে অনেক মানুষ উপস্থিত থাকলেও বিপদে পড়া কোনো ব্যক্তিকে সাহায্য করার প্রবণতা কমে যায়। যত বেশি মানুষ সেখানে থাকে, দায়িত্ব তত বেশি ভাগ হয়ে যায়; ফলে কেউ এককভাবে দায়িত্ব নিতে চায় না। প্রত্যেকেই মনে করে, ‘অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবে।’ একে ‘ডিফিউশন অব রেসপনসিবিলিটি’ বা দায়িত্বের বিস্তারও বলা হয়। এই কারণেই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়েও অনেকে সাহায্যের হাত বাড়ায় না।

এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি ধারণা হলো ডিইনডিভিজুয়েশন। আপনি যদি একজন ব্যক্তিকে একা একটি ইট দিয়ে বলেন যে ‘অমুক জানালার কাচ গুঁড়িয়ে দাও’, তিনি সম্ভবত তা করবেন না। কিন্তু ওই একই ব্যক্তি যদি কোনো ভিড়ের অংশ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর বিবেক তাকে সেই কাজ থেকে আটকাবে না। যখন মানুষ ভিড়ের মধ্যে নিজের ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে ফেলে, তখন ব্যক্তি হিসেবে তার নৈতিকতা ও স্বতন্ত্র দায়িত্ববোধও হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থায় মানুষ এমন আচরণ করতে পারে, যা একাকী অবস্থায় তার পক্ষে অসম্ভব হতো।

তৃতীয় ধারণাটি হলো কমপ্যাশন ফেড বা সহানুভূতির ক্ষয়। এটি এমন এক প্রবণতা, যেখানে একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ দেখলে আমাদের মধ্যে সহানুভূতি জাগে। কিন্তু একই দুর্ভোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা যত বেশি হয়, আমাদের আবেগ ও সহানুভূতি ততই কমতে থাকে। যেমন একটি অসুস্থ শিশুর গল্প শুনে মানুষ সহজেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু যদি বলা হয়, ‘লাখো শিশু একই সমস্যায় ভুগছে’, তাহলে অনেকের সাহায্য করার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। মানুষের আবেগের এই সীমাবদ্ধতা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, জাস্ট ওয়ার্ল্ড ফ্যালাসি। এটি এমন মানসিক প্রবণতা, যেখানে মানুষ পৃথিবীকে মূলত ন্যায্য বলে বিশ্বাস করতে চায়। অর্থাৎ বিশ্বাসটি এমন—ভালো মানুষের সঙ্গে ভালো এবং খারাপ মানুষের সঙ্গে খারাপই ঘটে। এই বিশ্বাসের কারণে অনেক সময় মানুষ ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করে বসে। যেমন ‘নিশ্চয়ই সে কিছু ভুল করেছিল, তাই তার সঙ্গে এমন হয়েছে’ বা ‘কেন তুমি ওই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করেছিলে’—এমন মন্তব্য ও প্রশ্নে এ ধরনের মানসিকতার প্রকাশ ঘটে।

সবশেষে, এভরিডে স্যাডিজম বা দৈনন্দিন নিষ্ঠুরতা। এটি একটি ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যের ছোটখাটো কষ্ট, অপমান বা অস্বস্তি দেখে আনন্দ বা তৃপ্তি পায়। যদিও তা সব সময় চরম সহিংস বা অপরাধমূলক নয়। যেমন—কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিব্রত করে মজা পাওয়া, অনলাইনে কাউকে ট্রল বা অপমান করে আনন্দ পাওয়া, কিংবা কারও ব্যর্থতা বা দুঃখ দেখে তৃপ্তি বোধ করা। এসব আচরণের মাধ্যমে মানুষের এই অন্ধকার দিকটি প্রকাশ পায়। সূত্র হিসেবে মিডিয়ামের তথ্য উল্লেখ করা যায়।