পাটশাক বর্ষাকালের একটি সহজলভ্য ও সস্তা শাক হলেও পুষ্টিগুণের দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান। বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ এই শাক স্বাস্থ্যের একাধিক দিকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাটশাকে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদান দৈনিক চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণে সক্ষম।
হাড় ও দাঁতের গঠন শক্তিশালী রাখতে পাটশাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের যথেষ্ট সমন্বয় রয়েছে। রান্না করা এক কাপ (৮৭ গ্রাম) পাটশাক থেকে প্রায় ১৮৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ৫৪ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়, যা প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক চাহিদার যথাক্রমে ১৪ ও ১৩ শতাংশ পূরণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের আদর্শ অনুপাত ২:১। ম্যাগনেশিয়ামের অভাবে ক্যালসিয়ামের সঠিক শোষণ ব্যাহত হতে পারে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যদিও পাটশাকে হাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি ও কে তেমন নেই, তবুও ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেশিয়ামের ভারসাম্য রক্ষায় এটি সহায়ক। দাঁত ও মাড়ির সুস্থতার ক্ষেত্রেও ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। এটি দাঁতের এনামেল শক্তিশালী করে এবং চোয়ালের হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত পাটশাক খাওয়ার ফলে দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
চোখের স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও পাটশাক উপকারী। ভিটামিন বি৬ এবং ফোলেট চোখের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় অবদান রাখে। পাটশাকে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ০.৪৯৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি৬ পাওয়া যায়, যা একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক চাহিদার ৩৮ শতাংশ পূরণ করে। এ ছাড়া গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, এই পুষ্টি উপাদানগুলো রাতকানা রোগ প্রতিরোধেও সহায়ক হতে পারে।
শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পাটশাকের ভিটামিন সি বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রচুর ভিটামিন সি দেহকে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ ও সাধারণ সর্দি-কাশির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। বর্ষার মতো আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় ফ্লু জাতীয় উপসর্গ দেখা দিলে পাটশাক সহজলভ্য ও কার্যকর একটি খাদ্য বিকল্প হতে পারে।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও পাটশাকে থাকা ফোলেট সম্ভাব্য উপকার দেখাতে পারে। ভিটামিন বি৯ বা ফোলেট নতুন কোষ তৈরি এবং ডিএনএ মেরামতের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। কিছু গবেষণা বলছে, পর্যাপ্ত ফোলেট গ্রহণ বিশেষ করে জরায়ুমুখ, কোলন এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করতে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি ১০০ গ্রাম পাটশাকে প্রায় ৯০ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক চাহিদার প্রায় ২২.৫ শতাংশ সরবরাহ করে।
ত্বক ও চুলের সুরক্ষায় পাটশাকের ভিটামিন বি২ বা রিবোফ্লেবিন দেহে স্বাস্থ্যকর কোলাজেনের মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কোলাজেন ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ও তারুণ্য ধরে রাখে এবং সূক্ষ্ম বলিরেখা কমাতে সহায়ক। অন্যদিকে, ভিটামিন বি১২-এর অভাবে অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা একটি সুষম খাদ্যের মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব। তাই পাটশাককে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা ত্বক ও চুলের যত্নের একটি প্রাকৃতিক উপায় হতে পারে।
পুষ্টিবিদদের মতে, মৌসুমি এই শাকটি নিয়মিত গ্রহণে সামগ্রিক স্বাস্থ্য উপকার লাভ করা সম্ভব। সূত্র: হেলথলাইন ও অন্যান্য গবেষণাপত্র।




