প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা সাধারণত মায়ের মতামতকে সম্মান করেন, কিন্তু কখনও কখনও নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মায়ের মতামতের বাইরে গিয়েও নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তা করতে না পারলে জীবনযাত্রায় বাধা আসতে পারে। এই অতিনির্ভরশীলতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘মাদার কমপ্লেক্স’। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ।

শৈশব থেকেই সন্তানকে আগলে রাখেন একজন মা। তিনি চান, তাঁর সন্তান সব সময় সেরা জিনিসগুলো পাক এবং সেভাবেই তাকে বড় করে তোলেন। নানান দিকনির্দেশনার মাধ্যমে মায়ের উপস্থিতির ছাপ পড়ে সন্তানের মনে। এমনকি মায়ের অনুপস্থিতিতেও সেই ছাপ থেকে যায়। মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতি, আবেগ, অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও ভয়—এসবের একটি গভীর প্রভাব শিশুর অবচেতন মনে তৈরি করে। সহজ ভাষায় এই বিষয়টিকেই ‘মাদার কমপ্লেক্স’ বলা হয়। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের ধরনও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বড় হওয়ার পরও এই কমপ্লেক্স টিকে থাকে। তবে এটি কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগ নয়, বরং এটি একটি মনোবিশ্লেষণমূলক ধারণা (সাইকোঅ্যানালিটিক্যাল কনসেপ্ট)। যেসব শিশু মা ছাড়া অন্য কারও তত্ত্বাবধানে বড় হয়, তাদের ক্ষেত্রে ওই মানুষটির সঙ্গেই ‘মাদার কমপ্লেক্স’ গড়ে ওঠে।

‘মাদার কমপ্লেক্স’-এর দুটি মেরু রয়েছে। একটি মেরু ইতিবাচক অনুভূতি দেয়, অন্যটি কিছুটা নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, শিশু যখন আঘাত পায়, তখন মা তার আশ্রয়স্থল। কিন্তু যদি সেই আঘাতটি মায়ের অবাধ্য হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে, তাহলে আশ্রয় পাওয়ার সময় ভয়ও কাজ করে—মনে হয় মা হয়তো বকবেন বা কঠোর শাস্তি দেবেন। শিশু বোঝে না যে শাসন করাও মায়ের দায়িত্ব। ফলে মায়ের সেই রূপও মনে গেঁথে যায়। সন্তানকে ভালো-মন্দ চেনানোর দায়িত্ব মায়ের, এবং তিনি হাজার জিনিসের ভিড়ে সেরাটাই বাছাই করে দিতে চান। একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এটি ঠিক, তবে বাড়াবাড়ি করলে সমস্যা তৈরি হয়।

যদি একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান মায়ের ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীল হয়ে যায়, তাহলে তার ব্যক্তিজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ছোট ছোট বিষয় দিয়েই এই সমস্যার শুরু। যেমন, একটি শিশুকে মা সব সময় পোশাক বা খাবার ঠিক করে দেন, শিশুর নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পড়ালেখা বা খেলাধুলার রুটিনেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে শিশু মতপ্রকাশের মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে, মা যদি সন্তানকে বোঝেন এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখেন, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কে সন্তান স্বস্তি পায়। ‘মাদার কমপ্লেক্স’-এর ইতিবাচক দিকটি তখন সারা জীবন ধরে কাজ করে। কিন্তু এর অন্যথা হলে সিদ্ধান্তহীনতা একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ মায়ের মতামত ছাড়া মধুচন্দ্রিমার স্থান চূড়ান্ত করতে পারেন না, এমনকি নিজের সাংসারিক জীবনেও নানান বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে পারেন।

বিশেষজ্ঞের মতে, ‘অতি যত্ন’ এড়িয়ে চলা উচিত। বাড়ন্ত শিশুর সবকিছুতেই মায়ের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বরং শিশুকে ভালো-মন্দ বোঝানো উচিত। পরিবার ও সমাজের নিয়মনীতি, মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং আদর্শের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে শিখিয়ে দেওয়া জরুরি। ছোট বয়স থেকেই শিশুকে বোঝানো উচিত যে বন্ধু বা সহপাঠীদের সঙ্গে মারামারি করা ঠিক নয়, পশু-পাখিকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়, অযথা গাছের পাতা ছেঁড়া অনুচিত। এভাবে বড় হলে অন্য মানুষের সঙ্গে ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে সংঘাতে জড়ানোর আশঙ্কা কমে। তবে শিশুকে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া উচিত—যেমন সে কোন রঙের জামা পরবে, কখন খেলবে, কোন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নেবে—এসব বিষয়ে তাকে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ দিন। ভুল করলে সে ভুল থেকেই শিখবে এবং ভবিষ্যতে ভুল এড়িয়ে চলতে পারবে। মা যখন আর সার্বক্ষণিক সঙ্গী থাকবেন না, তখনও তার প্রভাব—‘মাদার কমপ্লেক্স’—থেকে যাবে।