গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসংলগ্ন স্টেডিয়াম মোড়ের নিচে লুকিয়ে আছে ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত মোবাইল সার্ভিসিং মার্কেট। ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই পাতাল মার্কেটে মোট আটটি প্রবেশপথ রয়েছে, যার প্রতিটি আলো ও বাতাসের ব্যবস্থাসহ পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারে সহায়তা করে। পরপর সাজানো ১০৪টি দোকানে কাজ করেন চার শতাধিক টেকনিশিয়ান। কারও সামনে মাইক্রোস্কোপ রেখে সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ মেরামত, কেউ ডিসপ্লে ঠিক করছেন, আবার কেউ ব্যাক কভার বা রিমুভিংয়ের কাজ করছেন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই মার্কেট শনি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে; শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি।

মার্কেট পরিচালনার অফিস সচিব আবদুর রহমান জানান, এখানে মূলত মুঠোফোনের বিভিন্ন অনুষঙ্গের পাশাপাশি মেরামতের দোকানভিত্তিক বাজার গড়ে উঠেছে। নগরবাসী বিকল ফোন সচল করতে এখানে ভিড় করেন। ডিসপ্লে, চার্জিং, মাদারবোর্ড, ব্যাটারি, চার্জার পোর্ট, ব্যাক কভার বা সফটওয়্যারের সমস্যা—সব কিছুর সমাধান মেলে এখানে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও অনেকে আসেন এই মার্কেটে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেবা দিয়ে আসা টেকনিশিয়ান মো. রিফাত হোসেন বলেন, ‘এই মার্কেটকে আমরা মোবাইলের হাসপাতাল বলি, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল। যেখানে কম খরচে ফোনের সব ধরনের সেবা পাওয়া যায়। স্থানীয় পর্যায়ে ফোন ঠিক করতে ব্যর্থ হলে শেষ ঠিকানা হয় এই পাতাল মার্কেট।’

একই মার্কেটের শতাধিক দোকানের টেকনিশিয়ানদের কাছে সব রকম সমস্যার সমাধান সহজেই মেলে। এক দোকানে না হলে অন্য দোকানে ঘুরে ফোনের জটিলতা দূর করা সম্ভব। মো. রিফাত হোসেন জানান, ফোনে সমস্যা দেখা দেওয়ামাত্রই এখানে আনলে কম খরচে মেরামত করা যায়। একাধিক দোকান ঘুরলে সার্ভিস চার্জ বেড়ে যায়। কাজের ভিত্তিতে সার্ভিস চার্জ শুরু হয় ২০০ টাকা থেকে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দক্ষ টেকনিশিয়ানরা তিনভাবে যুক্ত হন—কেউ ছোট টেবিলের দোকান নিয়ে বসেন যেখানে ভাড়া প্রায় ২৫ হাজার টাকা, কেউ লভ্যাংশ শেয়ারের চুক্তিতে দোকানের সামনে বসেন, আর কেউ নির্দিষ্ট বেতনে চাকরি করেন।

২০১০ সালে দোকান দেওয়া কবির টেলিকমের স্বত্বাধিকারী কবির হোসেন বলেন, ‘প্রতি দোকানে পাঁচজন টেকনিশিয়ান থাকলে প্রত্যেকে গড়ে পাঁচটি ফোন ঠিক করেন, অর্থাৎ দিনে প্রায় ২৫টি ফোন মেরামত করা যায়। এখানে ফোন ঠিক না হলে গ্রাহককে নতুন ফোন কিনতে হতো, যা দেশের টাকা বিদেশে চলে যেত। আমরা ফোন বানাতে না পারলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ যোগ করে ঠিক করে দিতে পারি। উচ্চমূল্যের নতুন ফোন কেনার চেয়ে অল্প টাকায় পুরোনো ফোন ঠিক করতেই এখানে প্রতিদিন শত শত গ্রাহক আসেন।’ তিনি আরও জানান, আগে মোবাইল অ্যাকসেসরিজ পাইকারি বিক্রি হতো, কিন্তু এখন মফস্বল থেকেও সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করা যায় বলে দোকানমালিকেরা সার্ভিসকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।

এখানে ৭০ শতাংশ সমস্যা ডিসপ্লেকেন্দ্রিক, বাকিগুলো চার্জার, মাদারবোর্ড ও সফটওয়্যারসংক্রান্ত। সার্ভিস চার্জ ২০০ টাকা থেকে শুরু। মেরামতের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য চার্জার, ডেটা কেবল, অ্যাডাপ্টার, ইয়ারফোন, মেমোরি কার্ড, মেমোরি কার্ড রিডারসহ সব রকম অনুষঙ্গ কেনা যায়। ফোন সর্বোচ্চ চেষ্টায় সচল না হলে গ্রাহক চাইলে নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে অচল ফোনটি বিক্রি করতে পারেন; সচল যন্ত্রাংশগুলো খুলে অন্য ফোনে ব্যবহার করা হয়।

ক্রেতাদের জন্য কিছু পরামর্শ দেন কবির হোসেন—প্রথমত, খুব কম সার্ভিস চার্জে কাজ করাতে গিয়ে দোকানদার কম দামের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে পারেন, যা গ্রাহকের জন্য ক্ষতিকর। দ্বিতীয়ত, ডিসপ্লে পরিবর্তনের সময় ভালোভাবে লক্ষ রাখতে হবে, কারণ আঠা লাগানোর পর আর পরিবর্তন করা যায় না। তৃতীয়ত, প্রটেক্টর পলি লাগানোর ক্ষেত্রে পুরু পলি না নেওয়াই ভালো, কারণ এতে টাচ স্ক্রিনে সমস্যা হয়। ফোন দীর্ঘদিন সচল রাখতে তিনি বলেন, ফোন যেন হাত থেকে না পড়ে, পানিতে না পড়ে (ওয়াটারপ্রুফ হলেও সতর্ক থাকতে হবে), নষ্ট চার্জারের বদলে আসল চার্জার ব্যবহার করতে হবে এবং ডেটা কেবল, ব্যাটারি বা অ্যাডাপ্টার ভালো মানের নিশ্চিত করতে হবে।