সৌদি আরবের তায়েফ শহরে অবস্থিত ছোট্ট শ্বেতশুভ্র মসজিদটি নিছক ইট-পাথরের স্থাপনা নয়—বরং ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও শিক্ষণীয় এক সফরের স্মারক। নবুওয়াতের দশম বর্ষটি নবীজি (সা.)-এর জীবনে বিষাদের বছর হিসেবে চিহ্নিত। এই সময়ে তিনি হারান তাঁর প্রধান আশ্রয়স্থল চাচা আবু তালিব ও দীর্ঘদিনের সঙ্গী হজরত খাদিজাকে। মক্কায় নির্যাতন চরমে পৌঁছালে তিনি নিরাপদ ঘাঁটির সন্ধানে মক্কা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি শহর তায়েফে যাত্রা করেন। ইবনে কাসিরের 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' গ্রন্থে এ তথ্য বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

কিন্তু তায়েফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা দাওয়াত গ্রহণ তো দূরের কথা, চরম উপহাসের সাথে তাঁকে ফিরিয়ে দেন। তারা শহরের বখাটে ছেলেপেলে ও দাসদের লেলিয়ে দেয় নবীজির পেছনে। পাথরের আঘাতে নবীজির পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, জুতাও রক্তে ভিজে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আয়েশা (রা.)-এর প্রশ্নের জবাবে নবীজি নিজেই এই দিনটিকে ওহুদের দিনের চেয়েও কঠিন বলে উল্লেখ করেন। সহিহ বুখারির হাদিস নম্বর ৩২৩১-এ এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

রক্তাক্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় মক্কার পথে ফেরার সময় তিনি একটি আঙুর বাগানের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বিশ্রাম নেন। বাগানের মালিক কোরাইশের দুই শীর্ষ সর্দার উতবা ও শাইবাহ ইবনে রাবিয়া—যাঁরা ইসলামের ঘোর শত্রু এবং পরবর্তীতে বদরে নিহত হন—তাঁকে রক্তাক্ত দেখে মানবিক তাড়নায় নিজেদের খ্রিস্টান দাস আদদাসকে দিয়ে এক থোকা তাজা আঙুর পাঠান। ইবনে হিশামের 'আস-সিরাত আন-নাবাবিয়্যাহ' গ্রন্থে এ ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়।

আদদাস যখন আঙুরের পাত্র নবীজির সামনে রাখেন, তিনি খাওয়ার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলেন। এই শব্দ শুনে আদদাস থমকে যান। তায়েফ বা মক্কার পৌত্তলিকরা এভাবে কথা বলে না। তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই উপত্যকার মানুষ তো এমন কথা বলে না। আপনি কে?’ নবীজি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তোমার আদি বাড়ি কোথায়, তোমার ধর্ম কী?’ আদদাস জবাব দেন, ‘আমি ইরাকের নিনেভা শহরের এক খ্রিস্টান।’ নিনেভার নাম শুনে নবীজির রক্তাক্ত মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘তুমি তবে সেই পুণ্যবান নবী ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের লোক!’ আরও অবাক হয়ে আদদাস জানতে চান, কীভাবে এই মরুভূমির মানুষ ইউনুসের নাম জানেন। নবীজি বলেন, ‘ইউনুস ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আমিও আল্লাহর নবী।’ এই বাক্যটি আদদাসের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, সামনে বসা মানুষটি মক্কার কোনো সাধারণ নেতা নন—তিনি সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তাঁর নিজের কিতাবেও লেখা আছে। আদদাস নবীজির হাতে, পায়ে, কপালে চুমু খেতে শুরু করেন। ইবনে হিশামের গ্রন্থে উল্লেখ আছে, দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে উতবা-শাইবা আফসোস করে বলেন, ‘সর্বনাশ, লোকটা আমাদের দাসকেও নষ্ট করে দিল!’

তায়েফের সেই অন্ধকার দিনে আদদাসের এই তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক টুকরো সান্ত্বনা। পরবর্তীকালে সেই আঙুর বাগানের জায়গাতেই গড়ে ওঠে মসজিদে আদদাস। ইতিহাসের এই ঘটনা আমাদের শেখায়, বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে সফলতা লুকিয়ে থাকে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন। ‘বিসমিল্লাহ’র মতো একটি ছোট অভ্যাস কত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা প্রমাণ করে এই ঘটনা। নবীজির সামাজিক মর্যাদা ও আদদাসের দাসত্বের মধ্যে কোনো বিভেদ ছিল না—তিনি সমতার সাথে কথা বলেছেন। নবী ইউনুসকে ‘আমার ভাই’ বলে সম্বোধনের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, যুগে যুগে সব নবীই একই ঐশ্বরিক সত্যের বার্তা বহন করেছেন। সবচেয়ে যন্ত্রণার মুহূর্তেও নবীজির মনোযোগ ছিল অন্যের হেদায়েতের দিকে, নিজের কষ্টের দিকে নয়। তাই আজও তায়েফে আগতরা মসজিদ আদদাসের শান্ত পরিবেশে মুগ্ধ হন এবং বুঝতে পারেন, যখন দুনিয়ার সব মানুষ বিপক্ষে চলে যায়, তখনও আল্লাহর রহমতের একটা আঙুরের থোকা আর একজন বিশ্বস্ত আদদাস কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে থাকে।