এক সময় সমাজে নির্দিষ্ট বয়সে বিবাহ সম্পন্ন হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার গড়া এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে বিয়ের গড় বয়স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ফলে উপযুক্ত প্রস্তাব না আসা বা বিয়ে ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনায় অনেক তরুণ-তরুণী ও তাদের অভিভাবক মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠায় ভোগেন। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে অনেকে আধ্যাত্মিক আমল ও দোয়ার আশ্রয় নেন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়েতে বিলম্ব কোনো ব্যর্থতা নয়। পবিত্র কোরআনের বাকারা সুরার ২১৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ যা অপছন্দ করে তাতেই কল্যাণ থাকতে পারে। তাই বাহ্যিক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর সময়ের ওপর ভরসা রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিয়ে সংক্রান্ত প্রার্থনায় নবী মুসার দোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ফেরাউনের অত্যাচার থেকে পালিয়ে মাদয়ানে পৌঁছে নবী মুসা ছিলেন সম্পূর্ণ অসহায়। কুয়ার পাশে দুই নারীকে সাহায্য করার পর তিনি একটি গাছের ছায়ায় বসে দোয়া করেছিলেন, 'রব্বি ইন্নি লিমা আনঝালতা ইলাইয়া মিন খইরিন ফাকীর'। ইবনে কাসিরের তাফসির অনুযায়ী, ওই সময় নবী মুসা শুধু সামান্য খাবারের আশা করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে খাবার, নিরাপদ আশ্রয়, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান, নবী শো‘আইবের কন্যা এবং পরবর্তীতে নবুয়তের মতো বিরাট নেয়ামত দান করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, বান্দার ছোট্ট প্রার্থনাও আল্লাহর কাছে বিপুল কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
বর্তমানে সমাজে বিয়ে দ্রুত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যাভিত্তিক বিভিন্ন ‘অজিফা’ প্রচলিত আছে, যেমন সুরা ইয়াসিন নির্দিষ্ট নিয়মে পাঠ, ৪১ দিন ৩১৩ বার ‘আল্লাহ’ নাম জপ করা, বা সুরা তওবার ১২৯ নম্বর আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যক পাঠ করা। নেক আমলের উসিলায় দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়লেও এসব সংখ্যার কাঠামো সরাসরি রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ বা সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, পরবর্তী যুগের বুজুর্গদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের আমলের প্রচলন হয়েছে। তাই সুরা ইয়াসিন, মারইয়াম বা মুজ্জাম্মিল পড়া সওয়াবের কাজ হলেও নির্দিষ্ট সংখ্যার কাঠামোতে বাঁধা প্রয়োজন নেই। বরং দোয়ার আন্তরিকতা ও কান্নাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে নিশ্চিত চিত্তে দোয়া করো। জেনে রেখো, আল্লাহ কোনো উদাসীন অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।’
সুন্নাহসম্মত পথ অনুসরণ করতে চাইলে আলেমরা মূলত তিনটি বিষয়ে জোর দেন। প্রথমত, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। সুরা নুহের ১০-১২ নম্বর আয়াতে ইস্তিগফারের মাধ্যমে রিজিকের দরজা খোলার এবং সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ইমাম কুরতুবি বর্ণনা করেছেন যে, একজন ব্যক্তি হাসান বসরির কাছে দারিদ্র্য ও বিয়ের অভাবের কথা জানালে তিনি তাকে ইস্তিগফারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাহাজ্জুদ ও শেষ রাতের দোয়া। সহিহ মুসলিমের হাদিসে উল্লিখিত, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে বান্দার প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করেন, যা দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। তৃতীয়ত, কোরআনের সার্বজনীন দোয়া পাঠ। বিশেষত সুরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াত ‘রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা...’ আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য কোরআন-নির্দেশিত শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা।
যেসব অভিভাবক সন্তানের বিয়ের বিলম্ব নিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত, তারা ‘তাসবিহে ফাতেমি’ পাঠ করতে পারেন। ফাতেমা (রা.) কাজের ক্লান্তিতে সাহায্যকারী চাইলে নবীজি (সা.) তাঁকে শিখিয়েছিলেন ঘুমানোর আগে ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়ার আমল। সহিহ বুখারির হাদিসে এই আমলকে একজন সাহায্যকারী পাওয়ার চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উপরন্তু, নবীজি (সা.) বলেছেন, তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়—মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।
পরিশেষে, বিয়েতে বিলম্বকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে ধৈর্য, আস্থা এবং সঠিক করণীয় আমলের মাধ্যমে এই সময়কে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ইসলামে। লৌকিক প্রথা ও সংখ্যাভিত্তিক অজিফার পরিবর্তে কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইস্তিগফার, তাহাজ্জুদ এবং নবী মুসার দোয়ার মতো প্রমাণিত আমলগুলো পালন করাই সর্বোত্তম পথ।



