ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার অবশেষে একটি বিরল মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো ইসরায়েলি সরকার তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে সক্ষম হলো। নেতানিয়াহু নিজেও এর আগে কখনো পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের শেষ সপ্তাহগুলোতে একের পর এক বিতর্কিত আইন পাস করানো হয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি তাঁর অতি রক্ষণশীল ইহুদি (হারেদি) ও কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেছেন।

গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টের (নেসেট) অধিবেশন চলাকালে বিরোধী দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা নেতানিয়াহুর উদ্দেশে ‘লজ্জা, পদত্যাগ করুন, চলে যান’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে প্রধানমন্ত্রী ভোটাভুটিতে অংশ না নিয়েই অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতেও বিলটি পাস হয়। শুক্রবার নেসেট ভেঙে দেওয়ার আগে সরকার দ্রুত আরও কয়েকটি বিতর্কিত বিল পাস করিয়ে নেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব আইনের মূল লক্ষ্য ছিল আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোট অটুট রাখা। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো হারেদি সম্প্রদায়ের জন্য সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে ছাড় সংক্রান্ত আইন। ইসরায়েলে ১৮ বছর বয়সী সব নাগরিকের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও হারেদিরা বহু বছর ধরে এ নিয়মের বাইরে রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট বারবার এ ব্যবস্থা বাতিলের নির্দেশ দিলেও রাজনৈতিক কারণে তা কার্যকর হয়নি। গাজায় যুদ্ধের কারণে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত সেনা প্রয়োজন হলেও প্রায় ৭২ হাজার হারেদি তরুণ এখনো সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি।

এ পরিস্থিতিতে সরাসরি ছাড় না দিয়ে নেতানিয়াহু বিকল্প কৌশল গ্রহণ করেন। একটি আইনে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ‘তাওরাত’ অধ্যয়নের বিনিময়ে হারেদিদের সামরিক চাকরি থেকে ছাড় দেয়ার পথ সুগম হবে। আরেকটি আইনে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেয়া কয়েক হাজার হারেদি তরুণকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আইনি সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির এ বিষয়ে বিরল এক সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে এ আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি সেনাসদস্যদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহুর জোটসঙ্গীরা তাঁর অপসারণের দাবি তোলে। হারেদি রাজনৈতিক দল শাসের চেয়ারম্যান আরিয়েহ দেরি অভিযোগ করেন, সেনাপ্রধান রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন। তবে বিলটি পাস হলেও বিরোধী দলগুলো হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত আইনটির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।

হারেদি ইস্যু ছাড়াও সরকার শেষ মুহূর্তে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করায়। অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার বিলটি নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের বিচারব্যবস্থা সংস্কার কর্মসূচির অংশ। সমালোচকরা বলছেন, আইনটি কার্যকর হলে সরকার অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত উপেক্ষা করতে পারবে এবং বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের চেষ্টা আবার শুরু হতে পারে। এছাড়া সম্প্রচার-সংক্রান্ত আইনে বড় পরিবর্তন এনে সরকারের গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণের আইন নারী অধিকার ও শিক্ষা সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

জোটের অন্য শরিকেরাও সরকারের শেষ সময়কে কাজে লাগিয়েছেন। উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ২৪০ কোটি শেকেল (প্রায় ৭৯ কোটি ডলার) বরাদ্দের ঘোষণা দেন। তার দাবি, বর্তমান সরকারের সময়ে পশ্চিম তীরে অনুমোদিত নতুন বসতির সংখ্যা ১০৪টিতে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই মাসে ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ ইসরায়েলি ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে মৌলিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিরোধিতা করেছেন। আর ৬১ শতাংশ চান, পরবর্তী সরকারে হারেদি দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত না করা হোক। এই জনমতকে পুঁজি করে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট বলেন, ‘রাষ্ট্রের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক জোট টিকিয়ে রাখতে সরকার বেপরোয়াভাবে সমঝোতা করেছে।’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সরকারের পদক্ষেপকে ‘নিচু মানের এবং জায়নবাদবিরোধী’ বলে আখ্যা দেন।

তবে এসব সমালোচনায় খুব একটা বিচলিত নন নেতানিয়াহু। লিকুদ পার্টির এক নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মানুষের স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী। তাই একটি আইন নিয়ে সাময়িক অসন্তোষের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জোট ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আদালত শেষ পর্যন্ত এসব আইনে হস্তক্ষেপ করলেও নেতানিয়াহুর জন্য তা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। কারণ আদালতের সঙ্গে নতুন সংঘাত তৈরি হলে বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রচারণা আরও জোরালো হবে, যা নির্বাচনে সহায়ক হতে পারে।