রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বার্ক) মিলনায়তনে ‘এডুকেশন ফর অ্যা রোবাস্ট ইকোনমি: স্কিলস, ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যান্ড গ্লোবাল ইকোনমি’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন দেশে চলমান ‘অতিরাজনীতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় নানা অজুহাতে যারা রাজপথে নামে, তারা মূলত দেশের অগ্রগতি নয়, বরং অধঃপতন চায়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার তাদের জন্য দায়িত্ব নিয়েছে এবং কাজ করে যাচ্ছে, তাই তারা যেন ভেবেচিন্তে আন্দোলন করে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, কারও কোনো প্রশ্ন থাকলে তিনি সরাসরি কথা বলতে প্রস্তুত। কিন্তু বিনা কারণে হইচই করে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না। তিনি উল্লেখ করেন, গত ২০ বছরে শিক্ষা খাত অনেক পিছিয়ে গেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় কৃত্রিম নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্যই বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি জানান, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকে ৫০ হাজার ও মাধ্যমিক ও কলেজে হাজার হাজার শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আইনি জটিলতা কাটিয়ে এনটিআরসিএ এবং পিএসসির মাধ্যমে দ্রুত স্বচ্ছ নিয়োগের চেষ্টা চলছে। ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কেউ পাস করেনি বলে জানিয়ে তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কর্মসংস্থানহীন সনাতন বিষয়ে অনিয়ন্ত্রিত অনার্স কোর্স খোলা বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। উচ্চশিক্ষায় বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন মন্ত্রী।
সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে চলে যাওয়া প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল প্রচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। একটি অসম্পূর্ণ খসড়া দেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন শুরু হয়েছে উল্লেখ করে এই পরিস্থিতিকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে অভিহিত করেন শিক্ষামন্ত্রী।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের বৃহৎ জনসংখ্যা এখন এক প্রকার সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমন্বয় প্রয়োজন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র উপযোগী শিক্ষা প্রদানের ওপর জোর দেন। শিক্ষকদের প্রধান কাজ গবেষণা উল্লেখ করে তিনি উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানান, এমন একটি ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করতে যাতে শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই ক্লাসে ঢুকে ৩০ জুনের মধ্যে ডিগ্রি নিয়ে বের হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে শুধু বড় জিডিপি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, বহুমুখী উৎপাদন ও উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়নি, ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে। সংকট কাটাতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া, লেখা, গণিত ও যুক্তির মতো মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এই ভিত্তি দুর্বল হলে প্রযুক্তি বা এআইয়ের মতো জটিল দক্ষতা অর্জন কঠিন হবে। সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরি এবং ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, মান্দারিনসহ বিদেশি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শও দেন তিনি।
জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, শিক্ষায় পরিমাণগত সম্প্রসারণ ঘটলেও উচ্চশিক্ষায় বিস্তার ঘটেছে; কিন্তু অনেক তরুণ বিদেশে গিয়ে সেবা দিচ্ছে, ফলে দেশের কী হবে সেটি ভাবতে হবে। বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশে যত বেশি পড়াশোনা, তত বেশি বেকারত্ব। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের বেশিরভাগের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। শিক্ষাজীবনে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে চাকরির মৌলিক দক্ষতা দিয়ে বের করার ওপর জোর দেন তিনি। মার্কপলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী তাসফিয়া তাসবিন বলেন, সরকারি চাকরিতে ২১ লাখ আবেদনের বিপরীতে পদ মাত্র দেড় হাজার, কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগ্য মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সার্টিফিকেটের চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
সাংবাদিক ফারাবি হাফিজের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুশান ভাইজ, ইউসেফ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল করিম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান প্রমুখ।




