দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তগুলো শুধু প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা জাতীয় শিক্ষানীতির ওপরও প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিটের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পৃথক প্রশ্নপত্র তৈরির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুইটি আন্তর্জাতিক স্কুলের প্রধান। উইটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ জামান বলেছেন, এই পদক্ষেপের ফলে দেশের অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমান প্রতিযোগিতার ভিত্তি চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তিনি মনে করেন, এই নীতি ব্যক্তিগতভাবে তার প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক হলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য তা মারাত্মক ক্ষতিকর হবে বলেই তিনি এর বিরোধিতা করছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ডিগ্রির জন্য আবেদনকারীদের মধ্যে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা যৌক্তিক নয় বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, কোনো শিক্ষার্থী কোন বোর্ডে পড়েছে, তা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি হতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ও ধারণাগত দক্ষতার ভিত্তিতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর বা অস্ট্রেলিয়ার কোনো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ই ভিন্ন কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখে না। এই সিদ্ধান্ত একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে ভবিষ্যতে মাদ্রাসা বোর্ড, কারিগরি বোর্ড এমনকি আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েটের শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের দাবি তুলতে পারে। জাতীয় শিক্ষাক্রমকে একপাশে সরিয়ে রেখে বিকল্প শিক্ষাধারাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অর্থ হলো, রাষ্ট্র নিজেই জাতীয় কাঠামোর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা বোর্ডগুলোর মাধ্যমে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। রাষ্ট্রের এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যা এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। সংবিধানের সমান সুযোগের দর্শনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক বলেও তিনি মনে করেন। সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস ও নমুনা প্রশ্ন আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা, প্রশ্নের ভাষা নির্ভুল করা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও আধুনিক ও নিরপেক্ষ করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি জাতীয় ও ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রমের মধ্যে দক্ষতার ব্যবধান কমাতে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারের উচিত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, যাতে অভিভাবকদের বিদেশি কারিকুলামের ওপর নির্ভর করতে না হয়। একটি শক্তিশালী জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।