পূর্ববর্তী পর্বে দৈর্ঘ্য ও সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এবার দেখা যাক, কোনো পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে চলমান বস্তুর ভর কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। ধরা যাক, দুটি মহাকাশযান পরস্পরের পাশ দিয়ে সুষম বেগে যাচ্ছে। এক যানের নভোচারীরা অন্য যানের দিকে তাকালে দেখবেন, সেই যানের সবকিছু ধীরে চলছে এবং যানটি আগের চেয়ে চিকন দেখাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা, হার্টবিট, এমনকি পরমাণুর কম্পন—সবকিছুই যেন ধীর হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনগুলো চোখে দেখা না গেলেও, নিখুঁত যন্ত্রপাতি দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব।

ভর পরিমাপের দুটি পদ্ধতি রয়েছে: ওজন মাপা এবং গতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বল মাপা। ওজন মাপা নির্ভরযোগ্য নয়, কারণ মহাকর্ষ বল স্থানভেদে ভিন্ন হয়। পাহাড়ের চূড়ায় বা চাঁদে গেলে ওজন কমে যায়, কিন্তু ভর একই থাকে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে মাপা ভরকে জড়তা ভর বলে। এই জড়তা ভর মাপতে সময় ও দূরত্বের হিসাব লাগে, যেহেতু এই দুটিই আপেক্ষিক, তাই জড়তা ভরও আপেক্ষিক হয়ে যায়। কোনো বস্তুর স্থির ভর কখনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু আপেক্ষিক ভর পরিবর্তিত হয়।

লরেন্টজ সংকোচনের সমীকরণ দিয়ে দৈর্ঘ্য, সময় এবং ভরের পরিবর্তন হিসাব করা যায়। দৈর্ঘ্য ও সময় একই অনুপাতে বদলায়, কিন্তু ভর তার ব্যস্তানুপাতে বদলায়। উদাহরণস্বরূপ, দুটি মহাকাশযানের আপেক্ষিক বেগ যদি সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৩৫ কিলোমিটার হয়, তাহলে এক যানের নভোচারীরা অন্য যানটিকে অর্ধেক লম্বা, তার ঘড়ি অর্ধেক গতিতে চলতে এবং ভর দ্বিগুণ হতে দেখবেন।

এই কারণে কোনো বস্তুকে আলোর বেগে পৌঁছানো অসম্ভব। কারণ, গতি বাড়ার সাথে সাথে ভরও বাড়তে থাকে, ফলে আরও বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। আলোর বেগের কাছাকাছি গেলে ভর অসীম হয়ে যায়। বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে মনে হবে যানের দৈর্ঘ্য শূন্য, ভর অসীম এবং সময় থেমে গেছে। যানের ভেতরের নভোচারীরা নিজেদের কোনো পরিবর্তন দেখবেন না, কিন্তু পুরো মহাবিশ্বকে আলোর বেগে পেছনের দিকে ছুটতে দেখবেন।

আলোর চেয়ে বেশি বেগে কিছু পাঠানো অসম্ভব, কিন্তু পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে কিছু গতি আলোর বেগ ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেমন, বিশাল কাঁচির ছেদবিন্দু বা সার্চলাইটের আলোর স্পট আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে, কিন্তু সেখানে কোনো বস্তু বা সংকেত পাঠানো হয় না। বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো ভর ও শক্তির রূপান্তর। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ e=mc² দেখায় যে, অতি সামান্য ভর থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি তৈরি হতে পারে। সূর্যের শক্তি এই প্রক্রিয়ার ফল।

বোমা বিস্ফোরণ বা পরমাণু চুল্লি—সবই এই তত্ত্বের প্রমাণ। বিজ্ঞানীরা এখন ইলেকট্রনকে আলোর বেগের ০.৯৯৯৯৯৯৯৯৯ গুণ বেগে ছোটাতে পারেন, যার ফলে ইলেকট্রনের ভর স্থির ভরের চেয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার গুণ বেড়ে যায়। সময়ের আপেক্ষিকতাও পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হয়েছে। অতি দ্রুত চলা মেসন কণার আয়ু ধীর গতির কণার চেয়ে বেশি। এছাড়া, কণা ও প্রতিকণার সংঘর্ষে পুরো ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা ভবিষ্যতে মহাকাশযান চালানোর কাজে লাগতে পারে। জড়তা কাঠামোর বাইরে গিয়ে আলোর গতির সীমা নিয়ে আলোচনা করার পরবর্তী ধাপ হলো জড়তার ধারণা, যা পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে।