বর্তমান ফ্যাশন শুধু নান্দনিকতার প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন ব্যক্তিগত স্বস্তি ও মানসিক সুস্থতারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের ধারায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি বা ফিজেট জুয়েলারি। এসব অলংকার দেখতে সাধারণ আংটি, ব্রেসলেট বা নেকলেসের মতোই, কিন্তু এগুলোর নকশায় এমন কিছু সচল অংশ থাকে, যা আঙুল দিয়ে ঘোরানো, নাড়ানো বা চাপ দেওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এই পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া উদ্বেগের মুহূর্তে মনকে শান্ত করতে সহায়তা করে।

এই ধরনের জুয়েলারির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো স্পিনার রিং, যার বাইরের অংশটি স্বাধীনভাবে ঘোরানো যায়। পাশাপাশি রয়েছে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ধীর করে সচেতন শ্বাসাভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা ব্রিদিং নেকলেস এবং পুঁতি বসানো বা স্পর্শকাতর নকির বিভিন্ন ব্রেসলেট ও আংটি। বাইরের দৃষ্টিতে সাধারণ গয়নার মতো দেখতে হওয়ায় কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে তা সহজেই ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্ম এমন একটি আনুষঙ্গিক উপকরণ খুঁজছে, যা একইসঙ্গে ফ্যাশনেবল এবং তাদের উদ্বিগ্ন মুহূর্তে ছোট্ট একটি স্বস্তির মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। সামাজিক মাধ্যমেও এর প্রভাব পড়েছে; টিকটকে 'কমফোর্ট নেকলেস' ট্রেন্ডের ভিডিওগুলো লাখ লাখ দৃশ্যপ্রাপ্ত হয়েছে, যেখানে তরুণ-তরুণীরা উদ্বেগকালে গলার হার স্পর্শ করছেন বা ধরে থাকছেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেকের জন্যই প্রিয় কোনো গয়না একটি 'গ্রাউন্ডিং অবজেক্ট' বা মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনার বস্তু হয়ে উঠতে পারে। পরিচিত কিছু স্পর্শ করলে কিছু মানুষ অল্প সময়ের জন্য হলেও নিরাপত্তাবোধ অথবা স্বস্তি লাভ করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এই ব্যাপারে ভিন্ন মতও এসেছে। ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বেঙ্কেনডর্ফ ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ফিজেট ডিভাইস উদ্বেগ হ্রাস করে- এই দাবির পক্ষে এখনো জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। এর বিপরীতে, ২০২৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিলের একটি গবেষণাগারে পরিচালিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়, একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের স্পিনার রং ব্যবহারকারীদের উদ্বেগের মাত্রা গড়ে ২৪ শতাংশ কমেছে।

চিকিৎসকরা পরিষ্কার মত দিয়েছেন যে, এ ধরনের জুয়েলারি কারো কারো জন্য সাময়িক স্বস্তি বা মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার একটি উপায় হতে পার। আংটি ঘোরানো বা পুঁতি সরানোর মতো পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া অনেকের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করতে পারে। তবে এটি মোটেও উদ্বেগজনিত জটিলতার কোনো চিকিৎসা নয় এবং ঔষধ বা থেরাপির বিকল্প হতেও পারে না। যদি দীর্ঘসময় ধরে উদ্বেগ, আতঙ্ক বা মানসিক চাপ কারও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, ওসিডি বা বিএফআরবির মতো বাধ্যতামূলক আচরণের প্রবণতা আছে তাদের জন্য একই ধরণের নড়াচড়া করা ক্ষতিকর হতে পারে এবং তা বাধ্যতামূলক আচরণকে আরও উস্কে দিতে পারে।

সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন গয়নার ব্র্যান্ড মিনিমাল লুকের এন্টি-এনজাইটি রিং, ব্রেসলেট ও নেক্স বাজারে ছাড়ছে। স্টেইনলেস স্টিল, রূপা, সোনার প্রলেপ, এমনকি মূল্যবান পাথর ব্যবহার করেও তৈরি হচ্ছে এগুলো। ফলে সুস্থতার ধারণাটি সমসাময়িক ফ্যাশনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে। তারপরও, বিেজ্ঞদের মতামত হলো এই প্রবণতাকে অলৌকিক সমাধান ভাবার কোনো সুযোগ নেই। কারো জন্য এটি একটি ব্যক্তিগত সাময়িক স্বস্তির উপায় হলেও, প্রকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান হলো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনমাফিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা।