প্রতিদিন সকালে দাঁত মাজার সময় অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ব্যবহৃত টুথব্রাশ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেটে চলে যাচ্ছে কি না। সাধারণত সমুদ্র বা নদীকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের শেষ গন্তব্য হিসেবে ধরা হয়। স্রোতে ভেসে সমস্ত প্লাস্টিক সমুদ্রে জমা হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা কেবল পানিতে নয়, বাতাস, খাবার ও এমনকি মানুষের হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কেও উপস্থিত। এই বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, প্রতিদিনের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের দাঁতের ব্রাশ কি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে?
বেশির ভাগ টুথব্রাশের ব্রিসল বা ঘষার অংশ নাইলন নামক একধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। ডেন্টাল ফ্লসও অত্যন্ত সরু প্লাস্টিকের সুতা। নিয়মিত ঘর্ষণের ফলে এগুলো থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা তন্তু ছিটকে মুখের মধ্যে থেকে যেতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় ঠিক কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক বের হয়, তার কতটা শরীরে ঢোকে এবং তা কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি করে কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, থুতু ফেলার মাধ্যমে অনেক কণাই শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তাই ব্রাশ থেকে প্লাস্টিক বের হচ্ছে মানেই সরাসরি দেহের ক্ষতি হচ্ছে, এমন প্রত্যক্ষ দাবি করার সুযোগ নেই।
শুধু ব্রাশ বা ফ্লস নয়, টুথপেস্ট ও মাউথওয়াশের প্যাকেট নিয়েও বিশেষজ্ঞদের আলোচনা রয়েছে। বেশিরভাগ টুথপেস্টের টিউব ও মাউথওয়াশের বোতল গরম করে প্লাস্টিক গলিয়ে তৈরি হয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের পরিবেশ প্রকৌলীদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় খুব সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা পেস্টের মধ্যে মিশে যেতে পারে। তবে গবেষকরা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেন না যে ডেন্টাল পণ্য থেকে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হয়, এবং তার কতটা আমরা গ্রাস করি।
অন্যদিকে, দাঁতের যত্নের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত। নিয়মিত ব্রাশ ও ফ্লসের অভাবে দাঁতে ক্যাভিটি, মাড়ির রোগ, এমনকি দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তো বাড়েই, মুখের সংক্রমণ হৃদরোগসহ নানা জটিলতার সাথেও সম্পর্কিত। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন অবস্থায় দাঁতের যত্ন চালিয়ে যেতে হবে। ব্রাশ বা ফ্লস করার পর ভালোভাবে থুতু ফেলে দিতে হবে। দাঁতের চিকিৎসকেরা সাধারণত ব্রাশের পরে বেশি পানি দিয়ে কুলকুচি করতে নিষেধ করেন, কারণ ফ্লোরাইডের প্রভাব বজায় রাখা জরুরি। তবে সামান্য পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করলে অবশিষ্ট কণা বেরিয়ে যেতে পারে।
সচেতনতার আরেকটি দিক হলো, ব্রাশ ও ফ্লস করার সময় খুব জোরে ঘষাঘষি না করা, বরং নরমভাবে করা। অতিরিক্ত চাপ মাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ব্রিসল দ্রুত ক্ষয় করে। নরম ব্রিসল যুক্ত ব্রাশ ব্যবহার এবং তিন থেকে চার মাস অন্তর অথবা ব্রিসল বেঁকে গেলে তার আগেও ব্রাশ বদলে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্রাশ ও টুথপেস্ট সরাসরি রোদ বা উচ্চতাপের সংস্পর্শে রাখা থেকেও বিরত থাকতে হবে, কারণ অতিবেগুনি রশ্মি ও তাপে প্লাস্টিক দ্রুত ভেঙে যায়। পরিষ্কারের জন্য কুসুম গরম বা ঠাণ্ডা পানি যথেষ্ট।
বিকল্প পণ্যের বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা ধারণা দিচ্ছেন। বাজারে বাঁশের হাতলযুক্ত ব্রাশ বা সিল্ক ফ্লসের মতো বিকল্প রয়েছে যা প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে সহায়ক। তবে এগুলো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত বা সবার জন্য আরামদায়ক কিনা, তার নিশ্চিত প্রমাণ এখনো মেলেনি। পাশাপাশি এগুলোর দামও অপেক্ষাকৃত বেশি। মোটকথা, মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা চলমান থাকলেও এখনই দুশ্চিন্তার তেমন কিছু নেই। ভবিষ্যতে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁতের যত্নের যে প্রমাণিত উপকারিতা রয়েছে, সেটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।



