জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। একটি সঠিক সিদ্ধান্ত জীবনকে বদলে দিতে পারে, অন্যদিকে ভুল পদক্ষেপ বিপদের কারণ হতে পারে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মানুষের মন প্রায়ই দ্বিধা ও সংকোচে ভোগে, যা অনেক সময় মানসিক ক্লান্তিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইস্তিখারা করা এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার পরও অনেক সময় অন্তরে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখার বিকল্প নেই, কারণ সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া অপরিহার্য। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “যখন তুমি কোনো (সিদ্ধান্তে) সংকল্প গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
মহানবী (সা.) তাঁর প্রিয় চাচাতো ভাই ও জামাতা হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-কে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত অর্থবহ দোয়া শিখিয়েছিলেন, যা আমাদের জন্যও সমানভাবে কার্যকর। এই দোয়া মানসিক দোদুল্যমানতা দূর করে সঠিক পথ খুঁজে পেতে সহায়তা করে। হজরত আলী (রা.) পরবর্তীকালে খলিফা, দক্ষ বিচারক ও সমাজের নেতা হিসেবে অসংখ্য কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং এই দোয়া তাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে সহায়তা করেছে। নবীজি (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমন মুহূর্তে বলতে হবে— “আল্লাহুম্মাহদিনী ওয়া সাদ্দিদনী।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৫)
দোয়াটি উচ্চারণে অত্যন্ত সহজ এবং মনে রাখাও কঠিন নয়। এর উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহদিনী ওয়া সাদ্দিদনী। অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং আমাকে সরল-সঠিক পথে অবিচল রাখুন। নবীজি (সা.) দীর্ঘ কোনো প্রার্থনা শেখাননি; বরং মাত্র দুটি মূল শব্দের মধ্যে জীবনের যাবতীয় হেদায়েতের সারমর্ম নিহিত রয়েছে। এই দোয়ার দুটি অংশ বিশ্লেষণ করলে এর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়:
১. ‘ইহদিনী’: এর অর্থ আমাকে হেদায়েত দিন বা সঠিক পথ দেখান। এটি আল্লাহর কাছে সত্য ও সুন্দরের পথ চেনার প্রার্থনা। যেন তিনি ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দেন, অন্তরের চোখ খুলে দেন এবং হৃদয়ের কুয়াশা কাটিয়ে আসল কল্যাণের পথটি চিনতে সাহায্য করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন, সে-ই প্রকৃত সত্যপথপ্রাপ্ত।” (সুরা কাহফ, আয়াত: ১৭)
২. ‘সাদ্দিদনী’: এর অর্থ আমাকে লক্ষ্যে সোজা রাখুন। আরবি ‘সাদাদ’ শব্দটি তীরন্দাজের সরাসরি লক্ষ্যভেদের ধারণা থেকে এসেছে। তীরন্দাজ যেমন ধনুক থেকে তীর ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুর কেন্দ্রে আঘাত করে, তেমনি বান্দা প্রার্থনা করে—হে আল্লাহ, আমি যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হই। আমি যে সিদ্ধান্তই নিই, তা যেন নিখুঁতভাবে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছায় এবং আমাকে সেখানে স্থির রাখে।
এই দোয়া পাঠের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যাসীমা বা বিশেষ শর্ত নির্ধারণ করা হয়নি। জীবনের বড় বা ছোট যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এটি বেশি বেশি উচ্চারণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সেজদায়, তাশাহহুদে কিংবা শেষ রাতের তাহাজ্জুদের সময়—যখন দোয়া কবুলের দরজা উন্মুক্ত থাকে—গভীর আকুতি নিয়ে এই দোয়া পড়া উত্তম। এছাড়া আজান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়, আসরের পর থেকে মাগরিবের সময় কিংবা স্বাভাবিক চলাফেরার সময়ও এই জিকির মুখে রাখা সম্ভব। ইস্তিখারার নামাজের পর বা অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের সময় মনে মনে পাঠ করলে সিদ্ধান্তের ওপর স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।




