মানবজীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও উপকারের স্থান অত্যন্ত উঁচু। ইসলাম এটিকে কেবল নৈতিক গুণ হিসেবেই দেখে না, বরং ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। একে অপরের সুখে খুশি হওয়া, দুঃখের দিনে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানবিকতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু কিছু আচরণ রয়েছে, যা এই উপকারের সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে দেয় এবং আমলের প্রতিদানও নষ্ট করে ফেলে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো উপকারের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে খোঁটা দেওয়া।
দান-সদকার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। মানুষের প্রশংসা লাভ বা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বাসনা মিশে গেলে সেই আমল আর পবিত্র থাকে না। পবিত্র কুরআনে মুমিনদের উদ্দেশে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-সদকা বিনষ্ট না করে। কুরআনের ভাষায়, এমন দানের উদাহরণ একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার গায়ে সামান্য মাটি জমে ছিল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল এখানে ফসল ফলবে; কিন্তু ভারী বৃষ্টি আসতেই মাটির সেই আস্তরণ ধুয়ে গেল এবং উন্মোচিত হলো পাথরের শক্ত ও অনুর্বর চেহারা। তেমনিভাবে খোঁটা এবং লোক দেখানোর কারণে দান বাহ্যিকভাবে সুন্দর ও চকচকে মনে হলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি না থাকায় এর কোনো প্রতিদান থাকে না।
অনেক সময় মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে অন্যের কাছ থেকে সাহায্য নেয়, যদিও অন্তরে এক ধরনের সংকোচ ও অস্বস্তি কাজ করে। এই পরিস্থিতিতে সাহায্যকারী ব্যক্তি যদি সেই উপকারের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে খোঁটা দিতে থাকে, তবে তা গ্রহীতার মনে গভীর লজ্জা, অপমান ও যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কে ফাটল ধরতে বাধ্য। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে, সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি মানুষ এতটাই সতর্ক হয়ে যায় যে, ভবিষ্যতে সাহায্য নিতে ভয় পায় — কারণ আজকের সাহায্যই হয়তো আগামী দিনে অপমানের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে।
খোঁটা দেওয়ার ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি দান করার পর খোঁটা দেয়, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন না, তার দিকে তাকাবেন না এবং তাকে পবিত্রও করবেন না; তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। অর্থাৎ যে কাজটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হতে পারত, খোঁটার কারণে তা মানুষের শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উত্তম পন্থা হলো, উপকার করে সেটি ভুলে যাওয়া। মুমিনের বিশ্বাস থাকা উচিত যে, যা কিছু দেওয়া হয়েছে তার প্রকৃত মালিক তো আল্লাহই, আর প্রতিদানের আশাও তাঁর কাছেই করতে হবে। মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল কি না, মনে রাখল কি না বা বিনিময়ে কিছু দিল কি না, তা নিয়ে অস্থির হওয়ার দরকার নেই। এমনকি সম্ভব হলে নিজের উপকারের কথা অন্যের কাছে না বলাই উত্তম। কারণ, মানুষকে সাহায্য করে তার আত্মমর্যাদা রক্ষা করাও উপকারেরই অংশ। এক হাতে সাহায্য করে অন্য হাতে তার সম্মান কেড়ে নেওয়া হলে সেই সাহায্যের সৌন্দর্য আর থাকে না।
সুস্থ ও ভালোবাসার সমাজ গঠনে পারস্পরিক সহযোগিতা টিকে থাকে সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে। বিপদের সময় মানুষ মানুষের কাছেই আশ্রয় খোঁজে, এটিই একটি সমাজের প্রাণশক্তি। তাই উপকার এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের হৃদয়ে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার বোধ জাগিয়ে তুলবে। যদি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়, তবে কাউকে সাহায্য করার পর সেই সাহায্যের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। হজরত আবু তালহা (রা.)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।




