মানবজীবনের একটি বড় বিভ্রান্তি হলো ইহকাল ও পরকালের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য উপলব্ধি করতে না পারা। বস্তুজগৎকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা মূলত আত্মার নৈতিক পতন। ইসলামের দর্শনে বস্তুকে ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, তবে তাকে হৃদয়ের আসনে বা মোহের বশবর্তী করে রাখা অনুচিত। এই শিক্ষাই ইসলামি পরিভাষায় 'জুহদ' নামে পরিচিত, যা দুনিয়াবিমুখতার প্রকৃত রূপ।

অনেকে ভুল করে মনে করেন, 'জুহদ' মানে সংসার ত্যাগ করা, সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করা, কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া কিংবা দারিদ্র্যকে আলিঙ্গন করা। কিন্তু ইসলামে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এখানে 'জুহদ' বলতে বোঝানো হয়েছে অন্তরকে পার্থিব মোহমায়া থেকে পবিত্র রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হালাল বস্তুকে হারাম করা বা সম্পদ নষ্ট করাকে দুনিয়াবিমুখতা বলা হয় না; বরং প্রকৃত দুনিয়াবিমুখতা হলো আল্লাহর কাছে যা আছে তার তুলনায় নিজের হাতে থাকা সম্পদের ওপর বেশি আস্থা না রাখা।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪০)

পবিত্র কোরআনে দুনিয়ার নশ্বর রূপটি অত্যন্ত চিত্রময় ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো কেবল ক্রীড়া-কৌতুক, বাহ্যিক সাজসজ্জা, পারস্পরিক অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতার নাম। এর উপমা হলো সেই বৃষ্টি, যার ফলে উৎপন্ন ফসল কৃষকদের মুগ্ধ করে। পরে তা পেকে যায়, অতঃপর তুমি তা হলুদ বর্ণ দেখতে পাও এবং শেষে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আর আখিরাতে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। প্রকৃতপক্ষে পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়।' (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)

দুনিয়ার জীবনকে কোরআন একটি সংক্ষিপ্ত সফরের সঙ্গে তুলনা করেছে, যা স্থায়ী আবাস নয়। কোরআনে আরও বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি আখেরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সেই ফসলে প্রবৃদ্ধি দান করি; আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমি তাকে তা থেকে কিছুটা দিই, কিন্তু আখিরাতে তার কোনো অংশ নেই।' (সুরা শুরা, আয়াত: ২০)। মহানবী (সা.) মুমিনের দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে অবস্থান করো, যেন তুমি একজন বিদেশি মুসাফির বা পথচারী।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)

মুমিনের জন্য দুনিয়াকে কখনো কখনো 'কারাগার' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, 'দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।' (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১০২)। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মুমিনকে সংসার ত্যাগ করতে হবে; বরং দুনিয়ার মোহকে অন্তর থেকে বের করে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।

পরকালের চিরন্তন সাফল্য নির্ভর করে দুনিয়ার জীবনে করা সৎকর্মের ওপর। তাই ইহজীবন ও পরজীবনের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনে এই সুষম নীতির নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, 'আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তার মাধ্যমে আখিরাতের নিবাস লাভের চেষ্টা করো এবং দুনিয়া থেকেও নিজের অংশ অগ্রাহ্য কোরো না। আল্লাহ যেমন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তেমনি তুমিও অন্যের প্রতি অনুগ্রহ করো।' (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)

হাদিসে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি নবীজির (সা.) কাছে এসে অনুরোধ করলেন, 'আমাকে এমন একটি আমল বলুন, যা করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে।' উত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, 'তুমি দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হও, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের হাতে যা আছে তার প্রতি লোভহীন হও, তবে মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১০২)

আধুনিক ভোগবাদী সমাজে অর্থ ও প্রাচুর্যকেই সফলতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামি জীবনদর্শনে 'জুহদ'-এর গুরুত্ব অপরিসীম। পার্থিব জগৎকে পথ চলার মাধ্যম বানিয়ে পরকালকে মূল লক্ষ্য স্থির করাই 'জুহদ'-এর মৌলিক শিক্ষা। এটি মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয় না; বরং আত্মমর্যাদা ও ঈমানের আলোয় তাকে সমৃদ্ধ করে তোলে।