পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত। নিজেদের অজান্তেই প্রতিনিয়ত এই অদৃশ্য বিষ শরীরে গ্রহণ করছেন মানুষ। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫ গ্রাম প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে। বাতাস, পানি কিংবা প্রিয় খাবার—কোনোটিই এখন এই ক্ষতিকর কণার ছোঁয়া থেকে মুক্ত নয়। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আফলাতুন আকতার জাহান বলেছেন, দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসের কারণে মূলত তিনটি প্রধান পথে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে।
খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢোকে। বোতলজাত পানি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, সামুদ্রিক মাছ, প্রক্রিয়াজাত লবণ এমনকি টি-ব্যাগেও এই কণার সন্ধান মিলেছে। ওয়ান-টাইম বা প্লাস্টিক পাত্রে গরম খাবার ও পানীয় রাখলে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর রাসায়নিক গলে সরাসরি খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। এছাড়া শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমেও এই কণা শরীরে প্রবেশ করে। সিন্থেটিক তন্তুর পোশাক, ঘরের কার্পেট, আসবাবের ধুলা এবং যানবাহনের টায়ার ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ায়, যা সহজেই ফুসফুসে পৌঁছে যায়। ত্বকের মাধ্যমেও প্রবেশের পথ রয়েছে। ফেসওয়াশ, স্ক্রাব ও টুথপেস্টে ব্যবহৃত মাইক্রোবিডস এবং সিন্থেটিক কাপড়ের ঘর্ষণে ত্বকের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়েও শরীরে এই কণা ঢুকতে পারে।
গবেষণার তথ্য বলছে, রক্তনালির প্লাক, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ এমনকি মাতৃগর্ভের প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শরীরের ভেতরে এই কণাগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিক কণা জমা হয়ে ঘা সৃষ্টি করে। পাকস্থলীর ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলে এই কণা, ফলে হজমশক্তি কমে যায় এবং শরীর সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। শ্বাসতন্ত্রে জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ সৃষ্টি করে এটি। এর ফলে কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন ফুসফুসে জমা হলে টিস্যুতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়, যা পালমোনারি ফাইব্রোসিসের প্রধান কারণ। টেক্সটাইল বা পলিপ্রোপিলিন ইন্ডাস্ট্রির শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ক্রমাগত তন্তু প্রবেশের কারণে ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, পালমোনারি হাইপারটেনশন এবং পরবর্তীতে রেসপিরেটরি ফেইলিউরের মতো মারাত্মক পরিণতি দেখা দিতে পারে।
প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত বিসফেনল-এ ও থ্যালেটসের মতো উপাদান মানবদেহের এন্ডোক্রাইন সিস্টেমে ব্যাঘাত ঘটায়। এটি ইস্ট্রোজেনসহ অন্যান্য হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বিভ্রান্ত করে থাইরয়েড ও মেটাবলিজমে সমস্যা তৈরি করে। নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্যের জন্যও এটি ঝুঁকিপূর্ণ। পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান ও সংখ্যা কমায় এবং নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর কার্যকারিতা ব্যাহত করে গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি করে। দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগীর রক্তনালিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল, তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি। ক্ষুদ্র কণাগুলো কোষে প্রবেশ করে কোষের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ডিএনএ ভাঙনের কারণ হয়ে পরিপাকতন্ত্র, ফুসফুস ও থাইরয়েডে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শতভাগ দূর করা সম্ভব নয়, তবে কিছু সতর্কতামূলক অভ্যাসের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। বোতলজাত পানির বদলে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্রে পানি ও খাবার সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মাইক্রোওয়েভে কখনো প্লাস্টিকের পাত্র বা র্যাপিং পেপার ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ উচ্চ তাপে প্লাস্টিকের কণা দ্রুত খাদ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সুতি, লিনেন বা পাটের তৈরি পোশাক ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া এবং পলিয়েস্টার বা নাইলনের মতো সিন্থেটিক কাপড় এড়িয়ে চলা ভালো। ঘরের সিন্থেটিক কার্পেট এড়িয়ে নিয়মিত ভেজা কাপড়ে ঘর মোছা কিংবা ভ্যাকিউম করা উচিত। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও প্লাস্টিক মোড়কজাত খাবারের বদলে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে। টি-ব্যাগের বদলে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে পাতা চা ফুটিয়ে পান করাও নিরাপদ। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমেই রক্তে মিশতে থাকা এই অদৃশ্য বিষের মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।




