টিডি ব্যাংক পরিচালিত ২০২৬ সালের ‘লাভ অ্যান্ড মানি’ জরিপে ২,০০০ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে উঠে এসেছে যে, ব্যক্তিগত ঋণ ও অর্থনৈতিক অভ্যাস এখন মানুষের প্রেম ও দাম্পত্যজীবনের সিদ্ধান্তে গভীর প্রভাব ফেলছে। জরিপের তথ্য বলছে, ৪৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন যে, কোনো ব্যক্তির ঋণের বোঝা বা আর্থিক আচরণ তাদের সঙ্গে গুরুতর সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছাকে প্রভাবিত করে। এই প্রবণতা প্রজন্মভেদে স্পষ্ট পার্থক্য দেখিয়েছে। মিলেনিয়ালদের ৫১ শতাংশ এবং জেন জেডের ৪৯ শতাংশ এমনটি মনে করেন, যেখানে জেন এক্স ও বেবি বুমারদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৯ শতাংশ।

টিডি ব্যাংকের সম্পদ কৌশলবিদ অ্যাশলে উইকস জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানান, এই পরিবর্তন মূলত মূল্যবোধের পরিবর্তন নয়, বরং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, ছাত্র ঋণ, মুদ্রাস্ফীতি এবং আবাসনের উচ্চ ব্যয় তরুণদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অর্থনীতিকে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছে। উইকসের মতে, জেন এক্স ও বুমারদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, তরুণদের কাছে এখন সঙ্গীর আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে, বয়োজ্যেষ্ঠ প্রজন্মের অনেকে তরুণদের ওপর চাপানো এই অর্থনৈতিক বোঝা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জরিপে আরও দেখা গেছে, বিবাহপূর্ব চুক্তি বা প্রেনাপের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি। ঐতিহাসিকভাবে প্রেনাপের প্রতি মানুষের আগ্রহ এর চেয়ে কম ছিল। উইকস ব্যাখ্যা করেন, তালাকের অভিজ্ঞতা দেখে বড় হওয়া তরুণ প্রজন্ম এখন এই চুক্তিকে অবিশ্বাসের প্রতীক নয়, বরং সম্পদ পরিকল্পনার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে মিলেনিয়াল ও জেন জেডের নারীরা এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উইকসের পর্যবেক্ষণে, যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান, তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের সম্ভাবনা কম হতে পারে। কারণ, এই আলোচনা সম্পর্কের শুরুতেই যোগাযোগের দক্ষতা গড়ে তোলে, যা একটি সুস্থ সম্পর্কের পূর্বাভাস হতে পারে।

মেট্রো এলাকার মধ্যে মিয়ামি সবচেয়ে বেশি আর্থিক উদ্বেগের শহর হিসেবে উঠে এসেছে। সেখানে ৭৩ শতাংশ বাসিন্দা জানান, ব্যক্তিগত জীবনে আর্থিকভাবে সফল দেখানোর চাপ তারা অন্তত মাঝে মাঝে অনুভব করেন। এছাড়া, ৬৫ শতাংশ মিয়ামিবাসীর অন্তত একটি আর্থিক গোপনীয়তা রয়েছে, যা জাতীয় গড় ৫৬ শতাংশের চেয়ে বেশি। ৫৮ শতাংশ সেখানে অর্থনৈতিক বিষয়ে সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করতে লজ্জা বা ভয় অনুভব করেন, যেখানে জাতীয় গড় ৪৮ শতাংশ। মিয়ামির ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, অর্থনৈতিক কারণে তারা অন্তত একটি বড় জীবনের মাইলফলক পিছিয়ে দিয়েছেন, যা নিউ ইয়র্কের ৬৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়ার হারও মিয়ামিতে ৭৫ শতাংশ, যেখানে নিউ ইয়র্কে তা ৫৯ শতাংশ।

নিউ ইয়র্কে তুলনামূলকভাবে কম গোপনীয়তা ও বিলম্বিত মাইলফলক লক্ষ্য করা গেলেও, সেখানকার ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা জানান যে তারা অধিকাংশ আর্থিক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেন, যা জাতীয় গড় ২১ শতাংশের চেয়ে বেশি। নিউ ইয়র্কের ৫৬ শতাংশ প্রেনাপ বিবেচনা করতে রাজি, যা জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জাতীয় পর্যায়ে ৩০ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন যে, তারা সঙ্গী বা পরিবারের কাছ থেকে কোনো কেনাকাটা বা আর্থিক সিদ্ধান্ত লুকিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ১১ শতাংশ মানুষ এমন একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লুকিয়ে রাখেন যা তাদের ঘনিষ্ঠদের অজানা। উইকসের মতে, এটি একটি উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি। ক্রেডিট কার্ডের ঋণ, জুয়া এবং খারাপ ক্রেডিট স্কোর গোপন রাখার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি ইচ্ছাকৃত প্রতারণা নয়, বরং বিচারের ভয়ে মানুষের মধ্যে যোগাযোগের অভাবের ফল।

জরিপে আরও উঠে এসেছে যে, পরিবারের মধ্যে আর্থিক সাহায্য একমুখী নয়। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা পরিবার বা ঘনিষ্ঠজনের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। অন্যদিকে, প্রায় ৭০ শতাংশ বলেছেন, তারাও অন্যকে সাহায্য করেছেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’ হিসেবে নিজেদের চিহ্নিত করেছেন, যারা একই সঙ্গে সন্তান ও বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়দের ভরণপোষণ করছেন। উইকসের মতে, মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সাহায্য গ্রহণ ও প্রদানের উভয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

জরিপের সামগ্রিক চিত্র থেকে স্পষ্ট, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশে সম্পর্কের আর্থিক ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি। উইকসের ভাষায়, মানুষ বদলায়নি, তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এমন যে, সম্পর্কের শুরুতেই আর্থিক স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনা এখন একটি যৌক্তিক বিবেচনা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি কেউ কারো সঙ্গে অর্থ একত্রিত করেন, তবে সেই সঙ্গীর ঋণ ও ব্যয়ের অভ্যাস তাদের জীবন ও সম্পর্কের সন্তুষ্টির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডটকমে প্রকাশিত হয়।