রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও ক্ষোভ। পেশায় নির্মাণশ্রমিক শাওন আলী (২৫) গত সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দাফন করতে সময় লেগেছে প্রায় ২২ ঘণ্টা। ময়নাতদন্তের অভাবে এত দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় গ্রামের গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।
শাওনের মৃত্যুসনদে ডেঙ্গু, কার্ডিওজেনিক শক ও রক্তে সংক্রমণকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষের হাতে বেধড়ক মারধরের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ জন্য পুলিশের নিকট ময়নাতদন্তের দাবি জানানো হলেও তাঁরা কর্ণপাত করেননি। গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের ভাষ্য, থানায় এ ঘটনায় কোনো পুলিশ কেস দায়ের না থাকায় শব ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তিনি আরও বলেন, ২০ দিন আগের একটি লিখিত অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর কোনো জানা নেই।
ঘটনার সূত্রপাত জুন মাসের শেষ দিকে। ৩০ জুন ও ১ জুলাই—দুই দফায় প্রতিবেশী মো. রানা, তার বাবা মহবুল ইসলাম ও মা রিনা বেগমের হামলার শিকার হন শাওন। পাওনা টাকা চাইতে গেলে তাঁরা লাঠি ও লোহার রড দিয়ে শাওনকে প্রহার করেন বলে অভিযোগ শাওনের স্ত্রী আদরী বেগমের। এ ঘটনায় ২ জুলাই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন আদরী। প্রথম দফা মারধরের পর শাওনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কিছুদিন পর তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় জ্বরজনিত সমস্যা নিয়ে ১৭ জুলাই দ্বিতীয়বার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁর শরীরে ডেঙ্গুর উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
শাওনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসী ও স্বজনরা মরদেহ দাফনে বিলম্ব ঘটান। তারা আশা করেছিলেন পুলিশ এসে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নিয়ে যাবে। কিন্তু সারারাত অপেক্ষার পরও পুলিশের কোনো সাড়া মেলেনি। অবশেষে মঙ্গলবার সকালে মরদেহ দাফনে সম্মতি দেন তাঁরা। প্রতিবেশী কাজিম আলী জানান, ওসি হত্যা মামলা নেননি, তাই পোস্টমর্টেমের মাধ্যমেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যেত। কিন্তু পুলিশ সে ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত লাশ পচনের আশঙ্কায় দাফন করা হয়েছে। তিনি তদন্ত দাবি করেন।
শাওনের স্ত্রী আদরী বেগমের ভাষ্য, লাঠি দিয়ে তাঁর স্বামীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় দফা মারধরের পরের দিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেও সেখানে নানা জটিলতার কারণে বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হন তারা। পরে জ্বর নিয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তির পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এদিকে, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত মহবুল ইসলামের পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে এবং তাদের ঘরে তালা ঝুলছে। মহবুলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
থানার ওসি আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালে ভর্তির সময় পুলিশ কেস লেখা হয়নি। মৃত্যুসনদে ডেঙ্গু উল্লেখ থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্তের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই মৃত্যুর আসল কারণ চাপা পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসী এখন আইনি ব্যবস্থা ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।




