কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারকারীদের অনেকেরই অভিযোগ, এই প্রযুক্তি প্রায়শই ভুল উত্তর দেয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আসল সমস্যা হলো আমরা আদৌ সঠিক প্রশ্নটি করছি কি না, তা ভেবে দেখা। প্রশ্ন কীভাবে করা হচ্ছে তার ওপর উত্তরের প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করে, যার জন্য 'প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং' নিয়ে এত আলোচনা। তবে আপনার প্রম্পট কাঙ্ক্ষিত সমাধান দেবে কি না, সেটা বোঝার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় একটি কৌশল হিসেবে একাধিক এআই মডেলকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

এক্ষেত্রে একটি মডেলের উত্তর আরেকটিকে দেখিয়ে তাদের পারস্পরিক বিশ্লেষণ করিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যা অনেকটাই নিজস্ব 'এ/বি টেস্টিং'-এর মতো। কখনো কখনো দেখ গেছে, প্রতিযোগী এআইগুলোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকরী প্রম্পট তৈরি করে দেয়। ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সেইসব মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যারা এআই থেকে পাওয়া তথ্য কেবল গ্রহণ না করে সেটি যাচাই, পরিমার্জন এবং প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভিন্ন মডেলের উত্তর তুলনা করার সময় ঠিক এমনটিই হয়। প্রথম উত্তরটিকে সঠিক ধরে না নিয়ে বরং প্রশ্ন জাগে যে, কেন একটি মডেল অন্যটির চেয়ে ভিন্ন কিছু বলছে। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে অনেক সময় দেখা যায়, একটি অন্যটির ভুল ধরিয়ে দিয়েছে, আবার কখনো কোনোটিই পুরোপুরি সঠিক নয়, এবং তখন বোঝা যায় যে আসল ত্রুটিটি প্রশ্নেই লুকিয়ে ছিল, উত্তরে নয়।

বিভিন্ন এআই মডেলের সক্ষমতা ও কাজের ধরনও ভিন্ন। কোনোটির তথ্যবিন্যস্ত করার ক্ষমতা ভালো, তো কোনোটি এমন ধারণা দেয় যা আগে মাথায় আসেনি। মডেলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য হলে সঙ্গেসঙ্গে একটি সঠিক আরেকটি ভুল ধরে না নিয়ে বরং তাদের ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জটিল কোনো বিষয়কে প্রথম প্রাপ্ত উত্তরটি সরাসরি মেনে নেওয়ার চেয়ে অনেক গভীরে চিন্তা করতে সাহায্য করে। এআই আমাদের চিন্তার প্রতিস্থাপন না করে বরং আরও সতর্কভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। উত্তর তুলনা করে, ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রম্পট পরিশোধন করে সেই সমাধানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বেশি, যেটি মূলত সমস্যাটি সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।

তিনজন ভিন্ন ব্যক্তিকে একই প্রশ্ন করলে যেমন একই রকম উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা কম, এআই মডেলগুলোর বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং সহজাত সক্ষমতা ভিন্ন, তাই অভিন্ন উত্তর প্রত্যাশা করা সমীচীন নয়। একই প্রশ্ন বিভিন্ন মডেলকে করা হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা, তথ্য বিন্যস্তের ধরন কিংবা একেবারেই নতুন এক দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। এর মানে এই নয় যে একটি মডেল সবসময় অন্যটির চেয়ে ভালো, বরং সমস্যাটিকে তারা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে।

একাধিক মডেলের ব্যবহার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে: আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দেওয়া মানেই সেটি নির্ভুল নয়। কখনো দুটি মডেল একমত হয়, অথচ দুটিই ভুল; আবার কোনো কোনো সময় একটি মডেল এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় যা অন্যরা পুরোপুরি মিস করে। একটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়া উত্তর পেয়েই থেমে না গিয়ে আরও প্রশ্ন করা, তথ্যসূত্র চাওয়া বা ভিন্ন কোনো মডেলের প্রতিক্রিয় দেখা উচিত, বিশেষ করে নিবন্ধ লেখা, গবেষণা বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। এতে খুব বেশি সময় লাগে না এবং একাধিকবার বড় ভুল থেকে রক্ষা করে।

যদিও এই পদ্ধতি এআইয়ের প্রতি আস্থা বাড়ায়নি, বরং আরও ভালো প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, এবং এটাই এই প্রযুক্তির এক বিশাল সুবিধা। সব প্রশ্নের জন্য নয়, কিন্তু জটিল সমস্যা সমাধানে এই পদ্ধতি সবচেয়ে মূল্যবান। একাধিক মডেল ব্যবহার করলে প্রথম প্রাপ্ত উত্তরের প্রতি অন্ধ আকর্ষণ তৈরি হয় না। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়, ফলে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ পাল্টেও যেতে পারে।

দ্রুততম উত্তর খোঁজার চেয়ে উত্তরের সঠিকতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে বাড়তি কয়েক মিনিট সময় দেওয়াই ভালো। একাধিক এআই মডেল নতুন দিগদর্শন এনে দিতে পারে ও পূর্বধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, কিন্তু উত্তরটি সমস্যার সঙ্গে কতটা মানানসই সেই চূড়ান্ত বিচার মানুষেরই করতে হবে। তাই আলোচনার কেন্দ্র এখন প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাইরে গিয়ে উত্তরের মূল্যায়ন পদ্ধতির দিকে যাওয়া জরুরি। বিভিন্ন এআই মডেলের উত্তর তুলনা করা গবেষণা ও লেখালেখির দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।