কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহৃত হয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও এখন এতটাই নিখুঁত পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাস্তবের সাথে তফাৎ ধরা ক্রমশই দুরূহ হয়ে উঠছে। সামাজিক মাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রাণীদের মজার ভিডিও বা আলোড়ন তোলা ঘটনা অনেক সময়ই সম্পূর্ণ কম্পিউটার নির্মিত কি না, তা নিয়ে ধন্দে পড়েন ব্যবহারকারীরা। গত তিন বছরে প্রযুক্তির উৎকর্ষে নকল সহজে শনাক্তের উপায় কমলেও কিছু স্থায়ী ত্রুটি এখনও রয়ে গেছে, যা দিয়ে সতর্ক দর্শক সহজেই বুঝতে পারেন।
অতীতে 'ট্রাম্পোলিনের ওপর লাফানো খরগোশ' ভিডিওটি ব্যাপক আালোচিত হয়, যেখানে সিসি ক্যামেরার দৃশ্যের মোড়কে পুরোপুরি এআই নির্মিত একটি দৃশ্য সত্যি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরণের পরিস্থিতিতে সমস্যা শুধু ভুয়া ভিডিওর বিস্তারই নয়, বরং অনেক সময় বাস্তব ভিডিওকেও অনেকে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ভুয়া আখ্যা দিতে শুরু করে। ফলে জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং ভুল তথ্যের মাধ্যমে আবেগকে প্রভাবিত করার পথ সহজ হয়।
ভিডিওর মধ্যে চলমান বস্তু হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া বা একাধিক বস্তু একাকার হয়ে যাওয়ার মত অসংগতি একটি সাধারণ লক্ষণ। ‘খরগোশ’ ভিডিওটির শেষ প্রান্তে যেমন একটি খরগোশ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে, বা একটি খরগোশ আরেকটির আগমনে শূন্যে মিলিয়ে যায়। বড় জনসমাবেশের দৃশ্যেও এই রকম বিকৃতি প্রায়ই দৃশ্যমান হয়। পাশাপাশি, অনেক ভুয়া ভিডিও নিম্নমানের বা ঝাপসা দেখানোর কারণ হলো উচ্চ রেজল্যুশনে ভুলগুলো সহজেই ধরা পড়ে। তাই প্রায়ই সি ক্যামেরার ফুটেজ বল দাবি করা হয়।
লেখা-চিত্রও এআইয়ের একটি প্রধান দুর্বলতা। সাইনবোর্ড, পোস্টার বা দেয়াল লিখে অক্ষর জড়িয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ফন্ট বা অর্থহীন শব্দ দেখা যেতে পারে। ঘড়ির সময়র কাঁটা স্বাভাবিক কিনা তাও যাচাইয়ের একটি উপায়।
দৃশ্যগত দিক ছাড়াও শব্দের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। এআই নির্মিত ভিডিওয়র আওয়াজে অস্বাভাবিক প্রতিধ্বনি, হঠাৎ উচ্চারণ বদলে যাওয়া, অতি দ্রুত কথা বলার বা অস্বাভাবিকভাবে প্রাণবন্ত শোনার মত ‘এআই অ্যাকসেন্ট’ শনাক্ত হতে পারে। যদি কোনো পরিচিত ব্যক্তির মন্তব্য অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা বিচিত্র মনে হয়, তাহলে সাধারণ বিচারবুদ্ধি দিয়ে তা যাচাই করা জরুরি। কারণ, ভুয়া তথ্য শুধুমাত্র আবেগে উসকানি দিতেই তৈরি হতে পারে এবং তা সত্য তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়।
ভিডিওর উৎসটিও পরীক্ষা করতে হবে। কোনো নতুন অ্যাকাউন্ট একনাগারে ভাইরাল যোগ্য ভিডিও প্রকাশ করলে, একই ধরনের ভিডিওতে সামান্য বদল এনে বারবার আপলোড করলে, বা দিন-রাত না থামলে কন্টেন্ট পোস্ট করলে তা বট বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সন্দেহ জাগায়।
এআই স্থিরচিত্র চিহ্নিত করতেও কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। ছবির পটভূমির দৃশ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। ভবন, রাস্তা বা জানালা অসমান হতে পারে, সিঁড়ি হঠাৎ শেষ হয়ে যেতে পারে, কিংবা একাধিক ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে মিশে যেতে পারে। ঘরের সাধারণ বস্তু যেমন দরজার হাতল, আলমারি বা চুলার ডিজাইনে অসংগতি এআইয়ের ভুলের বড় ইঙ্গিত। এছাড়াও এআই তৈরী মানুষ প্রায়শই অতিরিক্ত মসৃণ ত্বক, চিহ্নহীন মুখ এবং নিখুঁত মেকআপ ও চুল নিয়ে উপস্থিত হয়, যা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি ‘পরিপাটি’ বোধ করায়।
‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি আরও জটিল এক চ্যালেঞ্জ। বাস্তব ভিডিওর ওপর অন্য মুখ বসিয়ে দেওয়ার এই কৌশলে পটভূমি ও আলো-ছায়া বাস্তব থাকে, ফলে চেনা মুশকিল হয়। সহপাঠীদের মুখ ব্যবহার করে অশ্লীল ভিডিও নির্মাণের মতো ঘটনাও ঘটেছে। শনাক্ত করার জন্য মুখের চারপাশে হঠাৎ ঝাপসা অংশ বা ‘ডিজিটাল আর্টিফ্যাক্ট’, এবং দ্রুত নড়াচড়ার সময় মুখের সাথে দৃশ্যের তাল মিলাতে না পারা এআইয়ের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত।




