মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) গত জুন মাসে সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ একটি অত্যন্ত তীব্র এল নিনো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। এই সম্ভাব্য ঘটনা ১৯৫০ সালে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো, যা রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালীগুলোর একটি, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ভয়াবহ বন্যা ও খরার সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে প্রায় ২২,০০০ মানুষের মৃত্যু এবং ৩৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। অন্যান্য বড় ধরনের এল নিনোর কারণে ফসলহানি, বিধ্বংসী পিটল্যান্ডের আগুন ও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিয়েছিল।
আবাব পরিস্থিতির প্রভাব আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে বিমান চলাচল ও উৎপাদন থেকে শুরু করে বীমা ও জনস্বাস্থ্য পর্যন্ত সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জলাবায়ু তথ্যের কোনো অভাব নেই। বরং সমস্যাটি হলো উদ্যোগের অভাব। এই অঞ্চলটিতে ইতিমধ্যেই কৃত্রিম উপগ্রহ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, অত্যাধুনিক জলাবায়ু মডেল এবং আঞ্চলিক পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মাসের পর মাস আগেই এল নিনোর সূত্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুরের আসিয়ান বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র (এএসএমসি)-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে ধোঁয়াশা ও পরিবেশগত অবস্থা পরিদর্শন করে আসছে।
তারপরও সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে হিমশিম খায়: কোন জনগোষ্ঠী প্রথমে চরম আবাওয়ার কবলে পড়বে? কোন পিটল্যান্ডগুলো সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে? কোন সরবরাহ শৃঙ্খগলো সবচেয়ে বেশি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে? এবং পরিবেশগত চাপ অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আগে কী করা উচিত? এই অঞ্চলের প্রয়োজন তথ্যকে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পরিণত করা, কেবল আরও অসংগঠিত তথ্য জড়ো করা নয়।
এক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মহাকাশযুক্তির সম্মিলন 'স্পেসএআই' তথ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে, নিছক সংখ্যা ও জীবন রক্ষার মতো ফলাফলের মধ্যে বিদ্যমান শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। স্পেসএআই মূলত কৃত্রিম উপগ্রহ-ভিত্তিক পৃথিবী নিরক্ষণ, বৃহৎ ভাষার মডেল, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং উন্নত বিশ্লেষণকে একত্রিত করে বিপুল পরিমাণ পরিবেশগত তথ্যকে পূর্বাভাসমূলক ও সিদ্ধান্ত-উপযোগী বুদ্ধিমত্তায় রূপান্তরিত করে।
সাধারণত, পৃথিবী পরিণত হয় পশ্চাৎদর্শী। উপগ্রহ ছবি তোলে, বিশ্লেষকরা তা ব্যাখ্যা করে এবং তারপর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর সরকার প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু এআইয়ের সাহায্যে সরকার আগেভাগেই পদক্ষেপ নিতে পারে। এআই মডেল উপগ্রহের চিত্রের সঙ্গে আবাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির আর্দ্রতা, উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য পরিবেশগত সূচক মিলিয়ে কোন এলাকাগুলো হুমতির মুখে তা শনাক্ত করতে পারে।
এটি কাল্পনিক কোনো ধারণা নয়: ইন্দোনেশিয়ার পিটল্যান্ডে আগুনের সংবেদনশীলতার মানচিত্র তৈরি করতে গবেষকরা ইতিমধ্যেই পিটের গভীরতা, উচ্চতা, ঢাল, গাছপালার ধরন, বৃষ্টিপাত এবং অবকাঠামো থেকে দূরত্বের সাথে স্যাটেলাইট ডেটা ও মেশিন লার্নিংকে সমন্বিত করেছেন। সুমাত্রার রিয়াউ প্রদেশে আরও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মহাকাশ-ভিত্তিক তথ্য ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরই অগ্নিকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে সৃষ্ট ঝুকিপূর্ণ মানচিত্রের ভিত্তিতে সরকারগুলো উচ্চাস্কের এলাকায় টহল ও অগ্নিনির্বাপন নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আগুন লাগার আগেই পিটল্যান্ড পুনরায় ভেজাতে ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াতে নিষ্কাশন খালগুলো বন্ধ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
উপগ্রহ এখন আর কেবল মহাকাশের ক্যামেরা নয়। প্রচুর পরিমাণে তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর (যা ব্যান্ডউইথ দখল করে এবং বিশ্লেষণে দেরি ঘটায়) বদলে এআই উপগ্রহের অভ্যন্তরেই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক তথ্যটি বেছে নেয়, যাতে সিদ্ধান্ত-গ্রহীতারা চিরাচরিত বিশ্লেষণের চেয়ে দ্রুত দরকারি তথ্য পান। সময়ের সামান্য অগ্রিমতা বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিদান দিতে পারে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই সরকার দুর্বল পিটল্যান্ডের পানির স্তর পুনরুদ্ধার করতে পারে। অগ্নি শুরু হওয়ার পর মোতায়েন না করে বরং শুরু হত্তয়ার আগেই দমনের সরঞ্জাম সঠিক স্থানে বসিয়ে রাখা যায়। কৃষক ও রসদ সংস্থাগুলো সংহতি ঘটার আগেই তাদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে। বীমা কোম্পানিগুলো আবাবিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে তাদের আওতা আরও নিখুঁতভাবে হিসাব করতে পারে।
তবে পূর্বাভাস ও প্রতিরোধ এক জিনিস নয়। এটাও সত্য যে, যদি সরকারের সদিচ্ছা বা সক্ষমতা না থাকে, তবে কেবল কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য থাকাই যথেষ্ট সাহায্যকারী নয়। কোনো ঝুঁকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগে তার মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন; কেবল ভালো তথ্য বা উন্নত বিশ্লেষণই পুরো সমস্যার সমাধান করে না। তবুও, স্পেসএআই-এর মূল্য নিহিত আছে সেই অনিশ্চয়তা দূর করার মধ্যে যা নীতি-নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত পেছানোর অজুহাত জোগায়।
এই অবস্থায় পৌঁছাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্রের প্রয়োজন, যা পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও আস্থাভাজন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংযুক্ত করবে। উপগ্রহ তথ্য তৈরি করে, এআই সেটিকে পূর্বাভাসমূলক বুদ্ধিমত্তায় রূপান্তরিত করে, এবং সরকার, জরুরি সহায়তা দানকারী ও ব্যবসায়ীরা সেই অন্তর্দৃষ্টিগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনায় রূপান্তর করে।
সিংগাপুর এই বাস্তবতন্ত্রের একটি রূপ কেমন হতে পারে তা তুলে ধরে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল স্পেস এজেন্সি অফ সিঙ্গাপুর (এনএসএএস) দেশটির সকল মহাকাশ কার্যক্রমকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে, যার পরিধির মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণ, শিল্প উন্নয়ন ও মহাকাশ ও এআই-এর জন্য দক্ষ জনবল তৈরির কাজ। ২০২২ সাল থেকে সরকার ইতোমধ্যে মহাকাশ গবেষণা ও উন্নয়নে ২০০ মিলিয়ন সিংগাপুর ডলার (১৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং আসন্ন নিউএসএআর-২ সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার কনস্টেলেশন (যা অঞ্চলজুড়ে দিন-রাত ও সব-আবাওয়ায় শক্তিশালীভাবে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করবে) এই বিনিয়োগ কীভাবে কক্ষপথে তীক্ষ্ণ চোখে রূপান্তরিত হচ্ছে তা দেখায়।
বাকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য শিক্ষাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট উপগ্রহের চেয়ে এর পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়: একটি নিবেদিত সংস্থা, ধারাবাহিক তহবিল এবং সেই তথ্যকে সিদ্ধান্তে রূপান্তরে প্রশিক্ষিত জনবল। একবার এই অবকাঠামো গড়ে উঠলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলি পরবর্তী সমস্যার সমাধানে এগিয়ে যেতে পারবে: পরিশীলিত বিশ্লেষণকে কার্যকরী সিদ্ধান্তে রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় আন্তবিভাগীয় কর্মীশক্তি ও আন্তঃসীমান্ত আস্থা তৈরি করা।
জলবায়ু সহনশীলতা ক্রমশই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার একটি প্রশ্ন হয়ে উঠছে। যে দেশগুলো সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যর্থতা, জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা বা অর্থনৈতিক ক্ষতির আগেই সংঘটিত পরিস্থিতির পূর্বাভাস করতে পারে, তারা সেইসব দেশগুলোর ওপর একটি কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখবে যারা প্রথাগত প্রতিক্রিয়ামূলক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে চলেছে। পরবর্তী এক সুপার এল নিনোর জন্য সতর্ক ঘণ্টা ইতিমধ্যেই বেজে গেছে। স্পেসএআই মানুষের বিচার-বুদ্ধিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না, এবং এটি যা প্রকাশ করে তার ওপর কাজ করার রাজনৈতিক ইচ্ছার বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে না। তবে এটি জানা ও কর্মের মধ্যে ব্যবধান সীর্ঘ করতে পারে—এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিদ্ধান্তকারীদের জন্য বাকিটা নিজেদের পূরণ করে নেওয়া আরও সহজ করে তুলতে পারে।




