বৃহৎ আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) একটি অত্যাধুনিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। জেনারেটিভ এআই ও বড় ভাষার মডেলগুলো (এলএলএম) মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য তাৎক্ষণিক ‘কগনিটিভ ফার্স্ট এইড’ বা জ্ঞানগত প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কাজ করতে পারে। এসব প্রযুক্তি সুলভ মূল্যে এবং চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইনে পাওয়া যায়, যা প্রচলিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাকে পূরণ করার একটি সুযোগ তৈরি করে।

ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগের শিকার মানুষেরা সাধারণ জেনারেটিভ এআই, যেমন চ্যাটজিপিটি-র কাছেই প্রথমে ছুটে যান। কারণ তারা আগে থেকেই রান্না বা গাড়ি মেরামতের মতো দৈনন্দিন পরামর্শের জন্য এই টুল ব্যবহার করে আসছেন। এই সুবিধা হলো, এআই যে কোনো স্থান থেকে ২৪ ঘণ্টাই সহায়তা দিতে পারে। প্রয়োজনীয়তা শেষে যাদের অতিরিক্ত সহায়তা দরকার, তারা মানব থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হতে পারেন।

তবে, এই প্রয়োগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। এআই অনুপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারে বা নিরাপত্তার বেড়া ভেঙে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। সম্প্রতি ওপেনএআই এর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যেখানে অভিযোগ করা হয় যে তাদের এআই জ্ঞানগত পরামর্শে যথেষ্ট সুরক্ষা দেয়নি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে আত্মবিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, যা আত্মহননের মতো ঘটনার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এআই নিরাপত্তা ও গোপনেীয়তার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি তার গভীর ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা এআই-এর কাছে প্রকাশ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তথ্যটি কীভাবে ব্যক্তিগত রাখা হবে, কতদিন সংরক্ষণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট গোপনীয়তা আইন মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, এআইকে যদি কেউ আত্মহত্যার ইচ্ছার কথা বলে, তবে তাকে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গেউপযুক্ত মানবিক সংস্থায় রেফার করতে হবে।

একটি সরকারি উদ্যোগ হিসেবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহৃত বিশেষ হটলাইন বা ক্রাইসিস টেক্সট লাইনের মতো করে এআই টুলকেও যুক্ত করা যেতে পারে। ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো এর তদারকি করতে পারে। একটি বড় সুবিধা হলো, এআই-এর মাধ্যমে পরবর্তী বিশ্লেষণ চালানো। যেহেতু এটি ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ ও প্রশ্ন সংরক্ষণ করে, তাই দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক প্রতিক্রিয়ার ধরন ও প্রবণতা বড় পরিসরে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনাকে আরও উন্নত করা যাবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগের পর মানুষ সাধারণত বিশেষজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেই বেশি যায়, কিন্তু সেখানে মানসিক বিষয়টিকে গুরুত্ব নাও দেওয়া হতে পারে। এআই এই ঘাটতি পূরণ করে সবার আগে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং ও ট্রায়াজের কাজটি করতে পারে। এটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে কাকে মানবিক থেরাপিস্টের কাছে পাঠাতে হবে, যা সম্পদ সাশ্রয়ে সাহায্য করবে। তবে অপ্রয়োজনে রেফার করলেও বড় কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ এরপরও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব বাছাই প্রক্রিয়া থাকে।

সর্বোপরি, বিশেষজ্ঞরা মত দেন যে, এটি এখন একটি বিশ্বব্যাপী সামাজিক পরীক্ষণস্বরূপ। এআই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি একে সহায়ক শক্তিতেও পরিণত করা সম্ভব। তাই একটি সুচিন্তিত ভারসাম্য বজায় রেখে এর নেতিবাচক দিকগুলো ঠেকানো এবং ইতিবাচক দিকগুলো দ্রুত প্রসার ঘটানোর ওপর জোর দিতে হবে।