কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১২ জন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রয়েছেনও ১২ জন। শুধু এই প্রতিষ্ঠানটিই নয়, জেলার আরও তিনটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এবার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে রাজারহাটের ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় এবং ভূরুঙ্গামারীর পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল সোমবার সকালে প্রকাশিত হয়। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বোর্ডের আওতাধীন ২২টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের ওই চারটি বিদ্যালয় রয়েছে।
তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দশম শ্রেণির একটি কক্ষে একা বসে আছে শিক্ষার্থী বাধন কুমার রায়। সে জানায়, শিক্ষকেরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়মিত নয়। একসময় ক্লাসরুম শিক্ষার্থীতে ভরপুর থাকত; এখন কেউ বাল্যবিবাহের কারণে, কেউ ঢাকায় কাজের সন্ধানে, আবার কেউ আগ্রহ হারিয়ে স্কুলে আসছে না।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তালতলা উচ্চবিদ্যালয় ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালে জুনিয়র পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমোদন পাওয়ার পর এবারই প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, আর শিক্ষক রয়েছেন প্রধান শিক্ষকসহ ১২ জন। আগামী বছর প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও জমিদাতা অজয় কুমার সরকার বলেন, মেয়েদের বাল্যবিবাহ এবং ছেলেদের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। উপজেলা সদর থেকে বিদ্যালয়টি প্রায় চার কিলোমিটার দূরে হওয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা শহরের বিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীদের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজারহাটের ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০২২ সালে নিম্নমাধ্যমিক হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পাওয়া যায়। বর্তমানে এখানে ১২৫ জন শিক্ষার্থী ও ৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। সহকারী শিক্ষক সফিকুল ইসলাম বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল; তাদের মধ্যে একজনের বাল্যবিবাহ হওয়ায় পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। বাকি চারজন এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই পাস করেনি। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতিও ভালো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কুড়িগ্রাম সদরের পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার মাত্র একজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল; সেও পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে ভূরুঙ্গামারীর পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০১২ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২৪৫ জন শিক্ষার্থী এবং ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এবার চারজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেম বলেন, প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয়নি, তাই তাঁরা বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। এটি বালিকা বিদ্যালয় হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয় এবং পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাঠদান চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তবে এবার প্রথমবারের মতো ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। কীভাবে এই সংকট কাটানো যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার জেলায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ হাজার ৮৯৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ১৭৯ জন। যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।




