বিশ্বকাপ আয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারেনি। মার্কিন মাটিতে ১৯৯৪ সালের পর প্রথমবারের মতো ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ শুরু হয় ১১ জুন। ফিফার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইভেন্টটি প্রধানত অবসর ও আতিথেয়তা (লেজার অ্যান্ড হসপিটালিটি) খাতে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার পূর্ণ-সময়ের চাকরির সমতুল্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারত। ওয়াল স্ট্রিটের অনেক ব্যাংক কম হলেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির আশা করেছিল।

কিন্তু সর্বশেষ সরকারি প্রতিবেদন বলছে, মে মাসে এই খাতে যতটুকু নিয়োগ বেড়েছিল, তা জুন মাসে পুরোপুরি খেই হারিয়েছে। বরং গত দুই মাসে খাতটিতে প্রায় ২১ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। পাঁচ সপ্তাহব্যাপী এই টুর্নামেন্টে নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত ১১টি হোস্ট শহরে দশ লাখের বেশি দর্শক আসার কথা ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সীমান্ত নীতি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে চাপে থাকা পর্যটন শিল্পের জন্য এটি কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

তা সত্ত্বেও, ব্যয়বহুল আবাসন ও ম্যাচের টিকিটের দাম চূড়ান্ত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। টিডি সিকিউরিটিজের মার্কিন অর্থনীতিবিদ এলি নির জানান, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ বিমান ভাড়া ও অন্যান্য বাধা বিশ্বকাপ ভ্রমণকে সীমিত করেছে, যা প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে প্রভাব ফেলছে। জুনের ২১-২৭ সপ্তাহে মার্কিন হোটেলগুলো প্রতি উপলব্ধ কক্ষে সর্বোচ্চ রাজস্ব অর্জন করলেও, এই উন্নতি বেশি অতিথি আসার কারণে নয়, বরং কক্ষ ভাড়ার হার বাড়ার কারণে। কোস্টারের তথ্য অনুযায়ী, হোস্ট বাজারগুলোতে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দখলের হার প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে, যদিও রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

প্রতিযোগিতাটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে হলেও অধিকাংশ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। খেলা শুরুর আগেই মার্কিন হোটেল শিল্প দুর্বল চাহিদার ইঙ্গিত দিয়েছিল। আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের এপ্রিল জরিপে হোস্ট শহরগুলোর ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে কম। হোটেল ব্যবসায়ীরা ফিফার অব্যবহৃত কক্ষ ব্লক ছাড়া, ভিসা বিলম্ব ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে দায়ী করেছেন। কোস্টারের মতে, কিছু ব্যবসায়িক ও অবকাশযাত্রী উচ্চ মূল্য এবং ভিড়ের কারণে হোস্ট শহরগুলো এড়িয়ে গেছেন।

ব্যাংক অফ আমেরিকার অর্থনীতিবিদ শ্রুতি মিশ্রা জুনের কর্মসংস্থান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে বলেন, হতাশাজনক নিয়োগ প্রবণতার সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হলো ব্যবসাগুলো নতুন লোক নিয়োগের চেয়ে প্রয়োজন হলে বিদ্যমান কর্মীদের ওভারটাইম দেওয়ার পক্ষপাতী। ব্যাংক অফ আমেরিকা পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে মে ও জুন মাসে এই খাতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার চাকরি সংযোজিত হতে পারে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে খাতটিতে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টায় কোনো বৃদ্ধি দেখা যায়নি এবং মজুরি বৃদ্ধিও অন্যান্য খাতের তুলনায় ধীর ছিল।

তবে সরাসরি ইভেন্টের কেন্দ্রে থাকা কিছু নিয়োগকর্তা ভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের লালা'স আর্জেন্টাইন গ্রিলের মালিক হোরাসিও ওয়েশলার জানান, আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন রিজার্ভেশন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়। প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের ভক্তরা যারা ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজেদের দলের খেলা দেখতে এসেছেন, তারাও রেস্তোরাঁয় ভিড় করছেন। কিন্তু তিনি তার ১০০ জনের বেশি কর্মীর জন্য নতুন নিয়োগের পরিবর্তে অতিরিক্ত শিফটের ব্যবস্থা করছেন। তার মতে, কর্মী খুঁজে পাওয়া কঠিন, তাই দীর্ঘদিন ধরে যারা কাজ করছেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, স্টেডিয়ামের কাছাকাছি এলাকায় কর্মসংস্থানে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। বেতন-প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যাটফর্ম গুস্টোর তথ্য বলছে, মে মাসে স্টেডিয়াম এলাকার বিনোদন ও খাদ্য-পানীয় কোম্পানিগুলোর নিয়োগ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভালো ছিল। কিন্তু আরও দূরের কিছু প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত জনবল নেওয়ায় আফসোস করছে। কানসাস সিটির হ্যামারস ডুয়েলিং পিয়ানো বারের মালিক ব্রেট ডাওয়েল মে মাসে পাঁচজন নতুন কর্মী নিয়োগ করেছিলেন। তবে বিশ্বকাপ পাওয়ার অ্যান্ড লাইট ডিস্ট্রিক্ট নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী বিনোদন কেন্দ্রের বাইরে পর্যটক কার্যক্রম প্রসারিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তিনি নতুন ওই কর্মীদের সময়সূচি বন্ধ করে দিয়েছেন। তার ভাষ্য, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি মূল্যবান ছিল না।