বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং মুদ্রাস্ফীতি উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। টানা পাঁচ বছর ধরে ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে মূল্যস্ফীতি থাকায় নীতি নির্ধারকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, এই বছরের শেষ নাগাদ ফেড অন্তত একবার সুদের হার বাড়াবে এবং দ্বিগুণ বা তার বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি।
মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টিকারী অন্যতম কারণ হলো এল নিনো। বিজ্ঞানীরা চলমান এই আবহাওয়া প্যাটার্নকে 'গডজিলা' বা 'সুপার' এল নিনো আখ্যা দিয়েছেন। এটি দক্ষিণ আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং অস্ট্রেলিয়া, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে শুষ্ক অবস্থা সৃষ্টি করবে। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের এক নোটে বলা হয়েছে, নরম পণ্য বা সফট কমোডিটিজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের এল নিনোর সময় কফি ও কোকোর দামে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসার মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় বড় উৎস। হাইপারস্কেলাররা এআই সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, যা সরবরাহ ও চাহিদায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। ডেটা সেন্টারের জন্য মেমরি চিপের চাহিদা এত বেশি যে ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মতো অন্যান্য খাতে সরবরাহ অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। অ্যাপল সম্প্রতি তাদের ডিভাইসের দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত একটি চীনা প্রতিষ্ঠান থেকে চিপ কেনার কথাও ভাবছে। ফেডের সর্বশেষ বৈঠকের নথি থেকে জানা গেছে, এআই-চালিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন। নিউ ইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামস সতর্ক করে বলেন, যদি এটি চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে টেকসই ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে, তাহলে ফেডের পক্ষে নিরুপায় হয়ে সুদহার বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি মূল্যস্ফীতির তৃতীয় উৎস হিসেবে কাজ করছে। গত বছর কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত খরচ নিজেদের কাঁধে নেওয়ায় শুল্কের প্রভাব কম দেখা গেলেও এখন সেই বোঝা ভোক্তাদের ওপর চাপানো শুরু হয়েছে। নিউ ইয়র্ক ফেডের জরিপে দেখা গেছে, প্রত্যক্ষভাবে শুল্কের মুখে পড়া ৪৭ শতাংশ পরিষেবা প্রতিষ্ঠান এবং ৪৪ শতাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরও মূল্য বৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করছে। ফেডের গবেষকদের মতে, শুল্ক আরোপের এক বছরের বেশি সময় পরও ব্যবসাগুলো দাম সমন্বয় করছে এবং এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে সম্পন্ন হচ্ছে।
যুদ্ধ-সম্পর্কিত মূল্যবৃদ্ধি চতুর্থ বড় কারণ। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযান যেমন জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করেছে, তেমনি পেট্রল ও ডিজেলের দামেও শক সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধকালীন উচ্চতা থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দাম তেমন কমেনি। যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা বেশি থাকায় এবং চীন সম্প্রতি জ্বালানি রপ্তানি সীমা শিথিল করায় এই চাপ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল পরিশোধন কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দেশটিকে জ্বালানি রপ্তানি কমাতে হয়েছে। বুধবার ডিজেল ফিউচারের দাম ১১ শতাংশ বেড়ে যায় যখন রাশিয়া এই জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। রুশ মোটরচালকরা পেট্রল পেতে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন এবং শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হয়েও মস্কোকে ভারত থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি, ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার শিপিং ব্যাহত হয়েছে এবং কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। শুক্রবার গমের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা মে মাসের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ এবং ইউরোপের বেঞ্চমার্ক দাম ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা এপ্রিলের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ।




