মানবদেহের সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে খাদ্যের ভূমিকা অপরিসীম। শুধু পেট ভরা নয়, খাদ্য আমাদের মানসিক শান্তি, আত্মিক একাগ্রতা ও দৈনন্দিন আচরণকেও প্রভাবিত করে। ইসলাম খাদ্যকে সব সময় ভারসাম্যের মধ্যে রাখার নির্দেশ দিয়েছে, যার সঙ্গে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের মতামতের মিল রয়েছে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফলমূল রাখা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি সহজ উপায় হিসেবে বিবেচিত।
কোরআনে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘হালাল’ হওয়ার পাশাপাশি ‘তায়্যিব’ বা পবিত্র ও উপকারী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীর হালাল ও তায়্যিব খাবার আহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ‘তায়্যিব’ শব্দের অর্থের মধ্যে খাবারের বিশুদ্ধতা, গুণগত মান, তাজা অবস্থা এবং পুষ্টিগুণ নিহিত। ফলে একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো খাবারটি কীভাবে উৎপাদিত হলো, তাতে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা বিষাক্ত উপাদান আছে কি না—তা যাচাই করা।
খাদ্যাভ্যাসের আরেকটি মূল ভিত্তি হলো পরিমিতিবোধ। সুরা আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা খাওয়া ও পান করার নির্দেশ দিয়ে অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। মহানবী (সা.)-ও অতিভোজন নিরুৎসাহিত করে বলেছেন, মানুষের পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ হয় না। প্রয়োজনে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং বাকি অংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য খালি রাখার উপদেশ দিয়েছেন তিনি। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত খাওয়া স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মূলনীতির মধ্যেও পরিমিতি ও পর্যাপ্ততা অন্যতম। অন্যদিকে, খুব কম খাওয়াও শরীরকে পুষ্টিহীন করে তুলতে পারে।
সুস্বাস্থ্যের জন্য খাবারের প্লেটকে রঙিন ও বৈচিত্র্যময় করা একটি কার্যকর কৌশল। সবুজ শাক, লাল টমেটো, হলুদ মিষ্টিকুমড়া, কমলা গাজর—প্রতিদিনের তালিকায় বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। গবেষণায় প্রমাণিত, প্রতিটি রঙের ফলে ও সবজিতে ভিন্ন ধরনের ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় এ বৈচিত্র্য আনা শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ফল, শাকসবজি, ডাল, লাল চাল-আটা, বাদাম, বীজ, মাছ ও ডিমকে খাদ্যতালিকার মূল ভিত্তি করা উচিত। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত না খাওয়াই ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকাতেও অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত শর্করা এড়িয়ে প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামের খাদ্যাভ্যাসের আদবের মধ্যে রয়েছে ডান হাতে খাওয়া, খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, বিসমিল্লাহ বলা, ধীরে চিবিয়ে খাওয়া ও খাবারে ফুঁ না দেওয়া। এই অভ্যাসগুলো আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের ‘মাইন্ডফুল ইটিং’ বা মনোযোগ দিয়ে খাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসে খেজুর, মধু, দুধ, জলপাই, ডালিম ও লাউকে বরকতপূর্ণ খাবার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শুধু এগুলোর একটি নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করতে হবে। বরং দেশীয় হালাল ও পুষ্টিকর খাবার—যেমন ভাত, ডাল, দেশি মাছ ও শাকসবজি পরিমিতভাবে খাওয়াই সুন্নাহর মূল চেতনা।
সুস্থ থাকতে দামি বা বিদেশি খাবারের প্রয়োজন নেই। মসুরের ডাল, পালং শাক, ডিম, ছোট মাছ ও মৌসুমি ফল—এসব সাধারণ খাবার পুষ্টিগুণে অনন্য। মৌসুমি ফলমূল খাওয়া এবং ভেষজ বা ‘মিরাকেল ডিটক্স’ দাবি করা খাবার সম্পর্কে অন্ধ বিশ্বাস না রেখে বৈজ্ঞানিকভাবে সচেতন থাকা উচিত। খাদ্য নষ্ট করাও ইসলামে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য।




