ক্রিকেট ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র স্যার গ্যারি সোবার্স ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ক্রিকেট বিশ্বে। পাকিস্তানের এক ক্রিকেটপ্রেমী, যিনি ছোটবেলা থেকেই সোবার্সের ভক্ত, তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, সোবার্স ছিলেন ক্রিকেটীয় শৌর্য ও শালীনতার প্রতীক।
১৯৫৯ সাল, তখন তাঁর বয়স সাড়ে এগারো। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল পাকিস্তান সফরে আসছে—এই খবরই প্রথম ক্রিকেটের প্রতি তাঁর আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। সে সময় পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হানিফ মোহাম্মদের ৩৩৭ রানের ইনিংস ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড় ফেলে দেয়। তবে এই সিরিজেই তৃতীয় টেস্টে এক তরুণ খেলোয়াড় গারফিল্ড সোবার্স অপরাজিত ৩৬৫ রান করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরবর্তীকালে এই রেকর্ড ব্রায়ান লারা ভাঙলেও, সোবার্সের কীর্তি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।
স্মৃতিচারণকারী জানান, টেলিভিশনের যুগ তখনো আসেনি। রেডিওর ধারাভাষ্যই ছিল খেলার একমাত্র মাধ্যম। নিজেদের বাসায় রেডিও না থাকায়, বন্ধু ইকবাল খানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তারা ধারাভাষ্য শুনতেন। ইংরেজি ধারাভাষ্য ওমর কোরেশী ও জামশেদ মার্কারের গলায় চমৎকার লাগত। ধীরে ধীরে সোবার্স তাঁর অসাধারণ ব্যাটিং, পেস-স্পিন বোলিং এবং নজরকাড়া ফিল্ডিংয়ের মাধ্যমে ক্রিকেটের 'সব্যসাচী দেবতা' হয়ে ওঠেন।
১৯৬৩-৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের লেখক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর 'রমণীয় ক্রিকেট' বইটি হাতে আসে। বইটিতে ১৯৬০ সালের প্রথম টাই টেস্টের বর্ণনা পড়ে তাঁরা রোমাঞ্চিত হন। সেই টেস্টে সোবার্স ১৩২ রান করেন এবং শেষ ওভারে ওয়েসলি হলের বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়া ২৩২ রানে অলআউট হয়ে প্রথম টাই টেস্টের সাক্ষী হয়। শঙ্করীপ্রসাদের বর্ণনায় সোবার্সের ব্যাটিংয়ের ছবি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে সোবার্স ৯৩ টেস্টে ৮ হাজার ৩২ রান ও ২৬ শতক করেছেন, যা টেন্ডুলকারের অর্ধেকের মতো হলেও তাঁর ব্যাটিং গড় ৫৭.৭৮। এছাড়া পেস ও স্পিন বোলিংয়ে তাঁর ২৩৫ উইকেট রয়েছে। জ্যাক ক্যালিসের মতো অলরাউন্ডারের চেয়েও সোবার্সের প্রতিভা অনন্য, কারণ ক্যালিসের ১৬৬ টেস্টের পরিসংখ্যান সোবার্সের ৯৩ টেস্টের চেয়ে অনেক বেশি। ১৯৬৮ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৬ বলে ৬ ছক্কা মারা প্রথম ব্যাটার তিনি। তবুও পরিসংখ্যান দিয়ে সোবার্সের মতো ক্রিকেটশিল্পীকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। স্যার লিয়ারি কনস্টেনটাইনের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর কীর্তি ক্রিকেটের ইতিহাস, বিবর্তন এবং ধ্রুপদি শিল্পের ছোঁয়ার সমন্বিত চেতনায় বুঝতে হবে।
শেষ পর্যন্ত সেই সোবার্সের প্রয়াণে ক্রিকেটপ্রেমীটি বলেন, সোবার্স ছিলেন তাঁর ও তাঁর ভাই মোমেনের ক্রিকেটপ্রীতি উচ্ছ্বাসে বারবার সোনালি মুকুট পরানো এক প্রতীক। আজকের নানা রঙের ক্রিকেটে বদহজমি ও বাড়াবাড়ির মধ্যে সোবার্সের কীর্তি হয়তো কম ঝলমলে মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর শৌর্য ও শালীনতা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।




