ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষে কোচদের সংবাদ সম্মেলন দর্শক ও সাংবাদিকদের কাছে ম্যাচের অজানা দিক উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে মাইক্রোফোনের সামনে এসে অনেকে বারবার একই পুরোনো ও নিরাপদ বাক্যাংশে আশ্রয় নেন। ২০২৬ বিশ্বকাপজুড়ে কোচদের এই প্রবণতা পরিমাপ করতে এআইভিত্তিক একটি ‘এক্সপেক্টেড ক্লিশে’ (এক্সসি) ট্র্যাকার তৈরি করেছে বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ‘সিঞ্চ’। ফুটবলের জনপ্রিয় ‘এক্সপেক্টেড গোল’ (এক্সজি) ধারণার আদলে তৈরি এই ট্র্যাকার বিশ্বকাপের ৪৬ জন প্রধান কোচের ৩৯৪টি সংবাদ সম্মেলন বিশ্লেষণ করে মোট ১৪,২৭০টি ক্লিশে চিহ্নিত করেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্লিশে ব্যবহারকারী কোচের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার কোচ টনি পপোভিচ। তিনি আটটি সংবাদ সম্মেলনে গড়ে ৫৯.৫টি করে মোট ৪৭৬টি ক্লিশে ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে প্যারাগুয়ের গুস্তাভো আলফারো (গড়ে ৫৮.৮টি), তৃতীয় স্থানে কেপ ভার্দের বুবিয়েস্তা (গড়ে ৫৫.৩টি)। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল ১৬টি সংবাদ সম্মেলনে মোট ৮১৩টি ক্লিশে ছুড়েছেন, যা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ একক সংখ্যা। গড়ে ৫০.৮টি ক্লিশে ব্যবহার করে তিনি তালিকায় চতুর্থ স্থানে আছেন। ব্রিটিশ মিডিয়া সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর টুখেলের এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে।

অন্যদিকে, সবচেয়ে খোলামেলা ও সোজাসাপটা কথা বলা কোচ হিসেবে নজর কেড়েছেন উরুগুয়ের মার্সেলো বিয়েলসা। তাঁর দল গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই বিদায় নেয়ায় তিনি মাত্র ছয়টি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন এবং গড়ে মাত্র ছয়টি ক্লিশে ব্যবহার করেন। কম ক্লিশে ব্যবহারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে কুরাসাওয়ের ডিক অ্যাডভোকাট (গড়ে ১৫.৩টি) এবং তৃতীয় স্থানে উজবেকিস্তানের ফ্যাবিও ক্যানাভারো (গড়ে ১৯.৫টি) রয়েছেন।

টুর্নামেন্টের ফাইনালিস্ট দুই কোচের মধ্যে স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে ছিলেন অন্যতম ‘ক্লিশে-নির্ভর’ কোচ। তিনি ১৬টি সংবাদ সম্মেলনে গড়ে ৪৪.৬টি ক্লিশে ব্যবহার করে ১১ নম্বরে অবস্থান করছেন। ট্রফি জয়ের পরও তাঁর মুখে শোনা গেছে ‘আমরা বিশ্বের সেরা দল এবং তা প্রমাণ করেছি’, ‘এই দল ছাড়া এটি অসম্ভব ছিল’—এর মতো চেনা বুলি। অন্যদিকে রানার্সআপ আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি হেরে যাওয়ার পরও ছিলেন সংযত। তিনি গড়ে ৩০.৯টি ক্লিশে ব্যবহার করে তালিকায় ২৭ নম্বরে রয়েছেন, যা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাভাবিক ও স্পষ্টভাষী হিসেবে বিবেচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, নকআউট বা সেমিফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে কোচদের ক্লিশে ব্যবহারের হার ৯ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতার তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোচরা নিজেদের ভুল বা কৌশল খোলাসা না করে নিরাপদ বাক্যাংশের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করেন। পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পাঁচটি ক্লিশে হলো: ‘আমরা প্রতিটি প্রতিপক্ষকে সম্মান করি’ (৯ কোচ, ১৫ বার), ‘আমরা কেবল আমাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোতে নজর দিচ্ছি’ (৯ কোচ, ১১ বার), ‘আমরা আমাদের নিজেদের শক্তি ও গুণাবলি জানি’ (৬ কোচ, ৯ বার), ‘আমাদের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে’ (৫ কোচ, ৭ বার), এবং ‘পুরো দেশ আমাদের পাশে আছে’ (৫ কোচ, ৭ বার)। ক্যাটাগরি হিসেবে কোচরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন ‘বিনয়’ (৩৮২ বার), ‘মাইন্ডসেট’ (৩৫৩ বার), ‘ক্যারেক্টার’ (২৭০ বার), ‘ন্যারেটিভ’ (১৫১ বার), ‘অ্যাপ্রোচ’ (১৪২ বার) ও ‘ট্যাকটিকস’ (১৩২ বার)।

সিঞ্চ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট জার্স্টম্যানের মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবল কোচদের চাপ ভিন্নধর্মী হলেও যোগাযোগের এই সংকট রাজনৈতিক নেতা বা ব্যবসার শীর্ষ নির্বাহীদের মতোই সর্বত্র এক। তিনি বলেন, চাপের মুখে সবাই নিজেদের বাঁচাতে এমন পরিচিত ও নিরাপদ শব্দ চয়ন করেন যা সহজে খণ্ডন করা যায় না। তবে ফলাফল যা-ই হোক, যেসব কোচ নিজেদের সিদ্ধান্ত সততার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন, ভক্তদের চোখে তাঁরাই আলাদা হয়ে থাকেন।