ডিজিটাল মিডিয়া সংস্থা এস৪ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা স্যার মার্টিন সরেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে তথ্য ভাগ করে নেওয়ার দক্ষতা। বিল গেটসের ১৯৯৯ সালের একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা জ্ঞান আটকে রাখা থেকে নয়, বরং তা বিতরণ করা থেকে আসে।’ সরেল মনে করেন, বর্তমান কর্পোরেট জগতে প্রচলিত ‘জ্ঞান গোপন করার’ প্রবণতা এআই-এর প্রভাবে টিকতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘এআই প্রতিষ্ঠানকে সমতল করে দেয়। বহু ব্র্যান্ড ও বহু স্তরবিশিষ্ট কোম্পানিতে মানুষ তথ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতার ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু যদি সবার জন্য তথ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই গতিশীলতা বদলে যায়। ভালো মানুষ যারা ভাগ করে নেবে, তারাই হবে প্রকৃত রাজা-রানি।’

মিডিয়া জায়ান্ট ডব্লিউপিপি-র প্রাক্তন প্রধান নির্বাহী হিসেবে ৩৩ বছর ফুটসে১০০ কোম্পানির নেতৃত্ব দেওয়া সরেল বর্তমানে ৮১ বছর বয়সে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, এআই বিপ্লব বিজ্ঞাপন শিল্পে ব্যাপক দক্ষতা বৃদ্ধি করবে, যদিও তিনি স্যাম অল্টম্যানের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন যে বিপণনের ৯৫ শতাংশ ভূমিকা এআই-এর কারণে বিলুপ্ত হবে। সরেল বলেন, ‘আমি মনে করি না ৯৫ শতাংশ চলে যাবে, তবে কিছু কাজ অবশ্যই যাবে। আমাদের শিল্প এখনও আশ্চর্যজনকভাবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চলে। এজেন্সিগুলোর আগ্রহ ছিল প্রকল্প যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করা এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্থানে ক্যাম্পেইন তৈরি করা। এখন আর তা করতে হবে না। বিজ্ঞাপন তৈরি সস্তা হয়েছে এবং আমাদের মডেল পরিবর্তন করে আরও সস্তা ও দক্ষ হতে হবে।’

তিনি বিজ্ঞাপন শিল্পের বর্তমান অবস্থাকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে কম্পিউটারাইজড ওয়ার্কফ্লো স্বাভাবিক। তিনি উল্লেখ করেন, ওয়াল স্ট্রিটে মেশিন ট্রেডিংয়ের মতো আমাদের শিল্পেও অ্যালগরিদমিক পদ্ধতি চালু হবে, বর্তমানে যেখানে ২৫০,০০০ মানুষ আধা-ম্যানুয়ালি বা সম্পূর্ণ ম্যানুয়ালি কাজ করছে। মোটরগাড়ি শিল্পের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে এআই-উৎপাদিত কনটেন্ট এখন ব্যাপকভাবে গৃহীত হচ্ছে, যদিও এই খাতটি অত্যন্ত পছন্দদায়ক হিসেবে পরিচিত।

এআই নিয়ে জনমনে নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে সরেল বলেন, ‘আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে হবে।’ তিনি ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে মেক্সিকোর একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনার কথা স্মরণ করেন, যেখানে অধ্যক্ষ জানিয়েছিলেন যে ইন্টারনেট মেক্সিকোর গ্রামগুলোর জন্য কী বিস্ময়কর কাজ করেছে—গ্রামগুলোর কোনো গ্রন্থাগার ছিল না, কিন্তু এখন তাদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যের উৎসে প্রবেশাধিকার রয়েছে, যেখানে তথ্যের প্রান্তিক খরচ শূন্য। সরেল বলেন, ‘এআই ইন্টারনেটের মতোই, তবে আরও শক্তিশালী। তথ্যের প্রান্তিক খরচ—শুধু কোম্পানিতে নয়, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশুদের জন্যও—শূন্য হয়ে যাচ্ছে। আমরা এই সরঞ্জাম দিয়ে এমন কাজ করতে পারছি যা আগে কখনো সম্ভব ছিল না।’

কাজের ধরণ পরিবর্তনের প্রসঙ্গে সরেল বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি ‘বিতরণকৃত কাজের’ যুগ নিয়ে এসেছে, যেখানে ল্যাপটপ থাকলেই যে কোনো স্থান থেকে কাজ করা যায়। তবে জেন জেড কর্মীদের পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জিং বলে মন্তব্য করেন তিনি। জেপি মর্গান চেজ ও ডব্লিউপিপি-র মতো কোম্পানিগুলো অফিসে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হিসেবে সরেল বলেন, ‘ব্যবসা পরিচালনাকারীরা অস্বস্তিকর বোধ করছেন। আমাদের মতো ব্যবসায় ইন্টারফেস ও ইন্টারঅ্যাকশনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। তরুণ কর্মীরা যদি ৫৫ মাইল দূরে থাকে, তাহলে তারা কীভাবে কোম্পানির সংস্কৃতি বুঝবে?’

অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের ১৯৩০-এর দশকের প্রবন্ধ ‘ইকোনমিক পসিবিলিটিজ ফর আওয়ার গ্র্যান্ডচিল্ড্রেন’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে সরেল বলেন, কেইনস ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জকে ‘আমাদের অবসর সময় কীভাবে কাটানো হবে’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এলন মাস্কের ‘প্রাচুর্যের যুগ’-এর ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গেও সরেল একমত হন। তিনি বলেন, ‘আমার মূল বক্তব্য হল, কেইনস সঠিক ছিলেন, তবে তিনি ১০০ বছর আগে সঠিক ছিলেন।’ তিনি মনে করেন, এআই বিপ্লব অবশেষে আমাদের জন্য ১৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ নিয়ে আসতে পারে।