ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করে বিদেশি উৎস থেকে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত হিউম্যানয়েড রোবট আমদানির ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৭ জুলাই, ২০২৬ ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন (FCC) এক ঘোষণায় এই সিদ্ধান্ত জানায়। সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করে যে, এই অত্যাধুনিক যন্ত্রগুলো আসলে 'ট্রান্টি হর্স'-এর মতো কাজ করতে পারে, যেগুলো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্সরের মাধ্যমে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট উপাত্ত সংগ্রহ করে তা সরাসরি বিদেশি সত্ত্বার কাছে পাচার করতে পারে।
সংস্থাটির বক্তব্য হলো, এসব রোবটের সাহায্যে নজরদারি চালানো অথবা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি দূর নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে এগুলোকে যেকোনো ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহারের জন্যও অধিগৃহীত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কর্মস্থলে একটি রোবটকে দূর থেকে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে কোনো গোপনীয় বৈঠক কক্ষে অবস্থান করে পুরো আলোচনা সরাসরি সম্প্রচার করার জন্য। এই পরিস্থিতি, ব্যক্তি জীবন ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান উভয়ক্ষেত্রেই এক ব্যাপক গোয়েন্দাগিরির চিত্র উস্কে দেয়। একজন ব্যবহারকারী অজান্তেই নিজের গৃহে এমন এক যন্ত্র স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে তার পরিবারের সদস্যদের তথ্য, অথিতিদের বৃত্তান্ত এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের মতো নানাবিধ গোপন তথ্য বিদেশি নির্মাতার কাছে পাঁছে দিতে থাকে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিদেশে হওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকারও অত্যন্ত সীমিত হয়ে পরে।
যদিও এই নিষেধাজ্ঞা সব বিদেশি উৎপাদকের বিরুদ্ধেই সমানভাবে প্রযোজ্য, তবুও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পরবে চীনের উপর। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারর প্রায় ৮৫ শতাংশই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে থাকায়, এই সর্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞার আর্থিক ও বাণিজ্যিক ধাক্কাটা তাদের জন্যই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে। তবে এফসিসি তাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করেনি; বরং একটি পশ্চা পন্থায় চীনের বাজার আধিপত্যকে মোকাবিলা করা হয়েছে বলে মনে করছে বিশ্লেষক মহল।
এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো মার্কিন অভ্যান্তরীণ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। বিদেশি প্রতিযোগিতা বন্ধ হলে স্থানীয়ভাবে আরও বেশি কোম্পানি এই প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ব্যবস্থা ও শিল্পভিত্তি শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে আমেরিকান গ্রাহক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এআই হিউম্যানয়েড রোবটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, আর তাই বিশাল এই অশোষিত বাজারকে ঘরোয়া উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করাটাই কৌশলী লক্ষ্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, শুধুমাত্র মার্কিন নির্মিত রোবট কিনলেই যে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার নিশ্চয়তা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে, তা নয়। এই যন্ত্রগুলোতেও গুপ্তচরবৃত্তি বা দূর নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। ইতিবাচক দিকটি হলো, কোনো মার্কিন প্রস্তুতকারক যদি গ্রাহকের ব্যক্তিগত অধিকার লংঘন করে, তবে দেশটির আদালতে এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার এবং ফৌজদারি দণ্ডের পাশাপাশি দেওয়ানি মামলার পথ উন্মুক্ত থাকবে। এর পরেও, বিশেষজ্ঞ মত হল—একবার তথ্য প্রকাশ হয়ে গেলে তা আর ফেরত যায় না। একজন বিখ্যাত নাট্যকার পুবিলিয়াস সাইরাস-এর বাণী উদ্ধৃত করে ফোর্বস-এর কলামিস্ট মন্তব্য করেছেন, 'যে ব্যক্তি নিরাপদ থাকা সত্ত্বেও সতর্ক থাকে, সেই বিপদ থেকে সবচেয়ে মুক্ত।' দৈনন্দিন জীবনটার অনিবার্য্য অংশ হয়ে ওঠা এই বুদ্ধিমান যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে ক্রেতাদের সবসময় সজাগ থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।




