ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর পরেও অনেক সফল মানুষ নিজেদের জীবনকে অর্থহীন ও শূন্য অনুভব করেন। পরিচিতি, খ্যাতি কিংবা বিপুল অর্থ — কোনটিই সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না বলে স্বীকার করেছেন একাধিক শীর্ষ নির্বাহী ও উদ্যোক্তা।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন আরিয়ানা হাফিংটন। ২০১৬ সালে নিজের প্রতিষ্ঠিত হাফিংটন পোস্ট ছেড়ে তিনি গড়ে তোলেন নতুন ওয়েলনেস ভেঞ্চার থ্রাইভ গ্লোবাল। ১১ বছর ধরে হাফিংটন পোস্টকে ডিজিটাল মিডিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন তিনি; নিউজরুমে ছিল ৮৫০-এর বেশি সাংবাদিক, অর্জন করেছিলেন প্রথম ডিজিটাল-নেটিভ আউটলেট হিসেবে পুলিৎজার পুরস্কার। টাইমসহ নামী সাময়িকীর প্রচ্ছদে জায়গা পেয়েছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন, ডাভোসের মতো মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। সব বিচারেই তিনি 'সফল'। এমন অবস্থা ছেড়ে নতুন পথে পা বাড়ানো অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হতে পারে — কিন্তু তিনিই তা করেছেন।
ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাফিংটন বলেন, 'সাফল্য এক ধরনের ফাঁদ। বহু সফল মানুষের জন্য সেটা ছেড়ে আসা অসম্ভব হয়ে যায়। বছর বছর নিজের দক্ষতা বাড়ানো, স্বীকৃতি অর্জন — একপর্যায়ে মনে হয় সব পেছনে ফেলে নতুন কিছু শুরু করা যায় না, এমনকি বর্তমান জায়গায় অসন্তুষ্ট থেকেও।' তিনি জানান, তার সিইও বন্ধুরা চাকরি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু ছেড়ে যেতে ভয় পান। আর্থিক ফাঁদটি সহজেই চোখে পড়ে — বড় বাড়ির মর্টগেজ, প্রাইভেট স্কুলের ফি, বিলাসবহুল ছুটির খরচ — মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের প্যাকেজে আটকে রাখে। তবে পরিচয়-সংক্রান্ত ফাঁদটি আরও সূক্ষ্ম কিন্তু কম বাস্তব নয়। 'তারা এতটাই সিইও ভূমিকার সঙ্গে বা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের অ্যাংকর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায় — সেটাই তাদের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।'
সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে আত্মতুষ্টি নয়, বরং শূন্যতা অনুভব করেছেন আরও অনেকে। উইংস্টপ ইউকে-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা টম গ্রোগান £৪০০ মিলিয়নে (প্রায় $৫৪০ মিলিয়ন) মালিকানার বড় অংশ বিক্রির পর উচ্ছ্বসিত হওয়ার বদলে নিজেকে খালি খালি মনে হয়েছে। 'সাত বছর ধরে মাথায় একটাই চিন্তা — ব্যবসাটাকে সফল করা। আর যখন সেখানে পৌঁছে যাই, ব্যাপারটা একটু অবাস্তব ঠেকে। যেমন — হয়ে গেল, এখন কী? আর সেই শূন্যতা অর্থ দিয়েও পূরণ হয় না।' গ্রোগান এভাবেই বলেছেন।
এয়ারবিএনবির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ব্রায়ান চেস্কি ছোটবেলায় 'নিদারুণভাবে সফল হতে চাইতেন' — ভেবেছিলেন তা এনে দেবে প্রশংসা। সমাজকর্মী বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে তিনি জানতেন, বড় অঙ্কের টাকা 'সব সমস্যার সমাধান' করে দিতে পারে। কিন্তু কোম্পানির ২০২০ সালের ব্লকবাস্টার আইপিও — যা তাকে বিলিয়নেয়ার বানিয়েছিল — তাঁর জীবনের 'সবচেয়ে হতাশাজনক সময়গুলোর একটি' ছিল।
লুমের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিনয় হীরামাথও একই রকমের ধাক্কা খেয়েছেন। আটলাসিয়ানে $৯৭৫ মিলিয়নে কোম্পানি বিক্রির পর 'আমি ধনী এবং আমার জীবন নিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না' শিরোনামের ব্লগ পোস্টে তিনি বর্ণনা করেছেন পরিচয়ের পতন। 'আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম' — লিখেছেন তিনি, জানিয়ে যে এই অর্থ 'অসীম স্বাধীনতা' এনে দিলেও তা নিয়ে কী করা যায়, তার কোনো ধারণা ছিল না।
নিজের চাকরির বাইরে কে তিনি — সেটা নিয়ে ইতিমধ্যেই ভাবছেন টিআইএএ-র সিইও তাসুন্দা ডাকেট। 'আমি আমার পদবি ভাড়া নিই, চরিত্রের মালিক আমি নিজেই।' সম্প্রতি ফরচুনকে বলেছেন তিনি। পদবি কখনো স্থায়ী নয় — তাই সেটাকে প্রকৃত পরিচয় ভাবার ভুল। 'বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল, দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, নৈতিক কম্পাস — এগুলোর মালিক আমি নিজেই।' হাফিংটনের ভাষ্য — একজন মানুষের জীবনে কোনো চাকরিই তাকে সংজ্ঞায়িত করে না, কোনো সাফল্যই তাকে নির্ধারণ করে না। নিজের হৃদয়ের ডাক শুনতে পারলে বেড়ে ওঠা এবং বিবর্তন সম্ভব। নিজেকে বদলানোর আগে যা ঘটে না — সেই প্রসঙ্গে মায়ের কণ্ঠস্বর তার কানে বাজে: 'ব্যর্থতা সাফল্যের বিপরীত নয়, সাফল্যের সোপান।'




