শ্রাবণের ধারাশেষে খুলনার বয়রায় এক নার্সারির বেড়ায় চোখে পড়ে ঝোপালো সবুজ পাতার মাঝে থোকা থোকা সোনারঙা ফুল। বৃষ্টিভেজা সেই ফুলগুলোর স্নিগ্ধতা লেখককে মুগ্ধ করে। নার্সারির মালিকের কাছে গাছটির নাম জানা যায় 'সোনাঝরা'। নামটি নিয়ে খটকা থাকলেও ফুলের আকর্ষণে একটি চারা কিনে আনা হয় ছাদবাগানের জন্য। বর্ষা শেষে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছাদের রেলিং বেয়ে গাছটি অপরাজিতার লতার সঙ্গে মিশে বেড়ে উঠেছে, হলুদ আর নীল ফুলের সমন্বয়ে এক অপূর্ব শোভা তৈরি হয়েছে।
পরে আগারগাঁওয়ের জাতীয় বৃক্ষমেলায় গিয়ে সেই গাছের প্রকৃত নাম জানা যায়। ডিসি নার্সারির দীপক দাদার মতে, গাছটির আসল নাম অস্ট্রেলিয়ান গোল্ড ভাইন। সোনার মতো হলুদ ফুল ফোটে বলেই এটি 'সোনালতা' নামে পরিচিত। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Tristellateia australasiae, গোত্র মালপিজিয়েসি। ইংরেজি নামের মধ্যে Australian Gold Vine, Shower of Gold Climber, Vining Galphimia উল্লেখযোগ্য।
সোনালতার আদি নিবাস অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে নিউ ক্যালেডোনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই লতা এখন বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি এটি বাগানের সুদর্শন আরোহী লতা হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে নাম নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে লেখক মনে করেন, 'সোনাঝরা' বা 'স্বর্ণলতা' নামের বদলে 'সোনালতা' বলাই শ্রেয়, কারণ স্বর্ণলতা নামে এদেশে অন্য একটি পরাশ্রয়ী গাছ রয়েছে।
এই লতার কিছু ঔষধি গুণও রয়েছে। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বৈদ্যরা গাছের মাটির নিচের কন্দ বা রাইজোম থেকে বিশেষ পানীয় তৈরি করেন, যা রক্তের লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকা বৃদ্ধিতে সহায়ক। ছোট আকারের চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী এ লতা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাষ্ঠল হয়ে ওঠে এবং ১০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। আদি বাসস্থানে এটি উপকূলীয় বন, জলাভূমি বা ঝিরির পাড়ে আগাছার মতো জন্মালেও বাংলাদেশে এটি বাগানের ফুলগাছ হিসেবেই পরিচিত।
প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে, তবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ফুলের সমারোহ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পাতার কোলের গিঁট থেকে বের হওয়া লম্বা পুষ্পমঞ্জরিতে ফোটে সোনার মতো উজ্জ্বল হলুদ তারকা আকৃতির ফুল। পাঁচটি পাপড়ির কেন্দ্রে থাকা লাল রঙের পুরুষ কেশরগুলো ফুলের সৌন্দর্যকে করেছে অনন্য। ফুল গন্ধহীন। দ্রুতবর্ধনশীল গাছটির পাতা প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা, বর্শার ফলার মতো, সূক্ষ্মাগ্র ও মসৃণ। একটি পুষ্পমঞ্জরিতে ৩০টি পর্যন্ত ফুল থাকে। ফল ডানাযুক্ত তারার মতো ক্যাপসুল, যা পাকলে বাদামি হয়ে যায়। বীজ ও কাটিং থেকে চারা তৈরি করা যায়।




