প্রযুক্তির এই যুগে মুহূর্তেই মুঠোফোনের পর্দায় বার্তা পৌঁছে যায়, কিন্তু একসময় প্রিয়জনের কাছে মনের কথা পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল হাতে লেখা চিঠি। সেই হারিয়ে যেতে বসা চিঠির জগৎকে পোশাকের ভাষায় নতুন করে তুলে ধরেছেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) ফ্যাশন স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী কে এম মাঈনুল হাসান। তাঁর এই কালেকশনের নাম ‘কালির দাগে ভরা প্রতিধ্বনি’। হাতে লেখা চিঠিতে যে অপেক্ষা, ব্যক্তিগত স্পর্শ আর মনের কথা ধরে রাখার মায়াময় ক্ষমতা থাকে, সেই আবেগ থেকেই নকশার সূত্রপাত। পুরোনো কাগজের টেক্সচার, বিবর্ণ কালির দাগ, খাম, স্ট্যাম্প আর হাতে লেখা ক্যালিগ্রাফি—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর নকশার মূল ভিত্তি। পুরোনো চিঠির মতো দেখতে বেজ ও অফ-হোয়াইট টোনের কাপড়ের ওপর কালো কালিতে লেখা অক্ষর কোনো পোশাকে পুরোটা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট অংশে তৈরি করেছে আলাদা নকশা। দূর থেকে দেখলে পোশাকগুলো মনে হয় যেন কোনো পুরোনো চিঠির পাতা। রঙের ব্যবহারেও পুরোনো কাগজের আবহ রাখা হয়েছে; অফ-হোয়াইট, ক্রিম, বেজ ও মাটির কাছাকাছি টোনের সঙ্গে কালো লেখার কন্ট্রাস্ট পোশাকে এনেছে ভিজ্যুয়াল আবেদন। লাল, নীল ও সাদা রঙের সরু স্ট্রাইপ, দড়ি ও ট্যাসেলের ডিটেইল যোগ করেছে প্রাণবন্ততা, যা ডাকটিকিট কিংবা ডাক বিভাগের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। শুধু রং বা প্রিন্ট নয়, কাট-প্যাটার্নেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন এই নকশাকার। পুরুষদের পোশাকে সাদা ও অফ-হোয়াইটের সরল সিলুয়েটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ বেজ ওভারলে বা লেয়ার, যার পুরোটাজুড়ে ছাপা হাতে লেখা অক্ষর। বেজ রঙের শার্টের এক পাশে চিঠির লেখার মতো প্রিন্ট, সাদা প্যান্টের নিচে লাল-নীল স্ট্রাইপ আর কোথাও ঝুলন্ত দড়ির ডিটেইল নকশাকে করেছে পরীক্ষাধর্মী। নারীদের পোশাকেও একই গল্প ভিন্ন ভিন্ন সিলুয়েটে ধরা দিয়েছে। বেজ টপের সঙ্গে সাদা প্যান্ট বা পালাজ্জো বটমে চিঠির লেখার প্রিন্ট, সাদা বডির ওপর বেজ অংশ যুক্ত হয়ে লাল-নীল-সাদা ট্যাসেলের সমাহার। একটি লুকে ভলিউমিনাস হাতার সাদা টপের সঙ্গে চিঠির লেখায় ভরা লম্বা বেজ লেয়ার তৈরি করেছে নাটকীয়তা, আর অফ শোল্ডার বেজ টপের সঙ্গে সাদা স্কার্টে লাল ও নীল রেখা এনেছে আধুনিকতা। থিমের ধারাবাহিকতা অ্যাকসেসরিজেও বজায় রাখা হয়েছে; লাল, নীল ও সাদা সুতার তৈরি ঝুল, ট্যাসেল, বিনুনি করা দড়ি, একই রঙের দুল ও চুড়ি এবং চুলে ফিতা বা দড়ির ব্যবহার পুরো লুককে একসূত্রে বেঁধেছে। এই কালেকশনের মূল বিশেষত্ব চিঠিকে পরিধানযোগ্য স্মৃতি হিসেবে ভাবার চেষ্টা। পোশাকের লেয়ার, অ্যাসিমেট্রিক কাট ও প্রিন্টের মাধ্যমে ভালোবাসা, অপেক্ষা, বিচ্ছেদ কিংবা স্মৃতিচারণার আবেগ দৃশ্যমান হয়েছে। ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও সিলুয়েটগুলো সম্পূর্ণ অতীতনির্ভর নয়; সাদা প্যান্ট, আধুনিক কাটের টপ, লেয়ারিং, অফ শোল্ডার নেকলাইন ও পরীক্ষাধর্মী ডিটেইলের মাধ্যমে সমকালীন ফ্যাশনের সঙ্গে পুরোনো চিঠির জগতের মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। ডিজাইনার মাঈনুল হাসানের মতে, এই সংগ্রহ প্রতিটি পোশাকে বহন করে গল্প ও লুকানো আবেগ। কাগজের চিঠি আজ বিরল হলেও কালি সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে গেলেও তার ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো থেকে যায়; সেই অনুভূতিকেই পোশাকের ভাঁজে, অক্ষরে ও রঙে নতুন জীবন দিয়েছেন তিনি।
হারিয়ে যাওয়া চিঠির স্মৃতি ফুটে উঠল বিইউএফটির শিক্ষার্থীর পোশাক নকশায়
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী কে এম মাঈনুল হাসান ‘কালির দাগে ভরা প্রতিধ্বনি’ শীর্ষক কালেকশনে হারিয়ে যাওয়া হাতে লেখা চিঠির আবেগকে পোশাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। পুরোনো কাগজ, কালির দাগ, খাম ও ক্যালিগ্রাফির উপাদানে সাজানো নকশায় মিলেছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়।




