মো. তরিকুল ইসলাম ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ লাভ করেছেন। এর আগে ৪১তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) কর্মরত। ৪৭তম বিসিএসে তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল প্রশাসন ক্যাডার, দ্বিতীয়টি পুলিশ ক্যাডার। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি মৌখিক পরীক্ষার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী সমসাময়িক বিষয়ে প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, মৌখিক পরীক্ষায় সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। তাই নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমে ভাইভা দেওয়ার প্রার্থীদের জন্য ইংরেজি পত্রিকা পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা তরিকুলের কাছে জানতে চান, তথ্য ক্যাডারে চাকরি করার পরও কেন তিনি প্রশাসন ক্যাডারে যেতে চান। জবাবে তরিকুল বলেন, প্রতিটি ক্যাডারেরই নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। তবে প্রশাসন ক্যাডারে মাঠপর্যায়ে জনগণের আরও কাছে থেকে কাজ করার সুযোগ বেশি। পাশাপাশি নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগও সৃষ্টি হয়। মৌখিক পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডার নিয়েও আলোচনা হয়। তাঁর বক্তব্য, পুলিশ ক্যাডারেও সাধারণ মানুষের সেবা করার বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়েছে।
নেতৃত্ব দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা যাচাই করতে চান বোর্ড সদস্যরা। তরিকুল স্কুলজীবনের একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অন্য এলাকার একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে তিনি তাঁর দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং সেই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর তাঁকে একটি পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্ন করা হয়: টস জিতলে তিনি ব্যাটিং না বোলিং বেছে নেবেন। তরিকুল উত্তর দেন, সিদ্ধান্তটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। মেঘলা আবহাওয়া বা উইকেটে আর্দ্রতা থাকলে তিনি বোলিং বেছে নেবেন, কারণ এমন পরিবেশে বোলাররা বাড়তি সুবিধা পান। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী উত্তরে বোর্ড সন্তোষ প্রকাশ করে।
মানসিক উপস্থিতি যাচাইয়ের জন্য একটি ধাঁধা দেয়া হয়। ধাঁধাটি ছিল: একজন বাবা ও তাঁর ছেলে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন, বাবা ঘটনাস্থলে মারা যান। ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়ার পর অপারেশন থিয়েটারের চিকিৎসক বলেন, 'এ আমার ছেলে, আমি তার অপারেশন করতে পারব না।' প্রশ্ন ছিল, চিকিৎসক ছেলেটির কে? তরিকুল তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দেন, চিকিৎসকটি ছেলেটির মা। তিনি সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হন।
সাহসিকতার পরীক্ষা হিসেবে একটি পরিস্থিতি উপস্থাপন করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, গাড়িতে যাওয়ার সময় কয়েকজন ব্যক্তি একজন নারীকে নির্যাতন করছে দেখলে তিনি কী করবেন। তিনি প্রথমে বলেন, ৯৯৯-এ ফোন করে তাদের থামানোর চেষ্টা করবেন। বোর্ড জানায়, ফোন করার কোনো সুযোগ নেই, তিনি একা এবং তাঁর কাছে কোনো অস্ত্রও নেই। জবাবে তরিকুল বলেন, তবুও তিনি তাদের আটকানোর চেষ্টা করবেন। বোর্ড জানায়, এতে তাঁর নিজের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, এমনকি চাকরিও হারাতে পারেন। তরিকুলের জবাব, 'চাকরি গেলে আবার পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কারও জীবন চলে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।' নিজের অবস্থানে অটল থাকায় বোর্ড সন্তুষ্ট হয়।
মৌখিক পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে বর্তমান কর্মস্থল বিটিভির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে চান বোর্ড সদস্যরা। তরিকুল বলেন, বিটিভির সম্প্রচার দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যাঁদের স্যাটেলাইট বা বেসরকারি টিভি দেখার সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় মাধ্যম হওয়ায় বিটিভিকে সবসময় সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে হয়, ফলে সমালোচনার স্বাধীনতা সীমিত। এছাড়া উপকরণ ব্যবস্থাপনার কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তিনি বলেন।
তরিকুল ইসলাম মনে করেন, মৌখিক পরীক্ষায় মুখস্থ নয় বরং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কোনো প্রশ্নে থেমে যাননি, প্রতিটি প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে নিজের মতো করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, এই বিশ্লেষণধর্মী উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছে।


