ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট, অলসতা এবং ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার প্রবণতা অনেক মানুষেরই নিত্যদিনের সঙ্গী। ইসলামি জীবনদর্শন অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পর্কের জটিলতা নিরসন এবং প্রলোভনের মুখে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সক্ষমতাকেই বলা হয় 'প্রজ্ঞা' (উইজডম বা হিকমা)। এই প্রজ্ঞা অর্জনের মাধ্যমে মানুষ তার জীবনের কল্যাণকর সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতে পারে। তবে প্রজ্ঞা লাভের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাপাচার, যা অন্তরে কালচে দাগ তৈরি করে এবং মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয়। সুরা নাহল-এর ৬৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শয়তান মানুষের জন্য ক্ষতিকর সিদ্ধান্তগুলোকেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে। এই বিভ্রান্তি কাটিয়ে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে এবং ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা লাভ করতে তিনটি বিশেষ ধাপ অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।
প্রথমত, তওবার মাধ্যমে মনকে পবিত্র করা। প্রজ্ঞা লাভের প্রাথমিক শর্তই হলো হৃদয়কে পাপাচারের কালিমা থেকে মুক্ত রাখা। কোনো মানুষ যখন পাপে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। পাপের মাত্রা বাড়লে এই দাগ পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে, যার ফলে ভালো ও মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা বা প্রজ্ঞা নষ্ট হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহর (হাদিস: ৪২৪৪) একটি বর্ণনা অনুযায়ী, মুমিন বান্দা পাপ করলে অন্তরে কালো দাগ পড়ে, তবে খাঁটি তওবা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে সেই অন্তর পুনরায় স্বচ্ছ ও চকচকে হয়ে ওঠে। সুরা মুতাফফিফিনে (আয়াত: ১৪) বর্ণিত অন্তরের 'মরিচা' বা জং দূর করার একমাত্র পথ হলো তওবা, যা বুদ্ধিমত্তার পথ উন্মুক্ত করে।
দ্বিতীয়ত, পাপ বর্জন এবং নিয়মিত আল্লাহর স্মরণ বা জিকির করা। মন পরিষ্কার করার পর তা রক্ষা করা জরুরি, কারণ প্রতিটি পাপ শয়তানের প্রবেশের পথ খুলে দেয়। তাই প্রজ্ঞাকে ধরে রাখতে পাপের সমস্ত দ্বার বন্ধ রাখা এবং ভুল হলে তৎক্ষণাৎ তওবা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যার জিকির-আজকার মনকে সুরক্ষিত রাখার শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। সুনানে তিরমিজির (হাদিস: ৩৩৮৮) একটি দোয়া—‘বিসমিল্লাহিল লাযী লা ইয়াদুররু মা‘আস মিহী শাইউন ফিল আরদ্বি ওয়া লা ফিস সামা-ই ওয়া হু ওয়াস সামী‘উল ‘আলীম’—নিয়মিত পাঠ করলে কোনো অনিষ্ট হতে পারে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির মানুষের চারপাশে একটি অদৃশ্য সুরক্ষা প্রাচীর গড়ে তোলে।
তৃতীয়ত, গভীর ভাবনা বা 'তাফাক্কুর'-এর চর্চা করা। বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় ব্যয় করাকে অনেকেই কর্মব্যস্ততা মনে করেন, কিন্তু ইসলামি দর্শনে 'উৎপাদনশীল নীরবতা' বা নির্জনে গভীর চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টিজগতের রহস্য এবং নিজের জীবনের ভুলত্রুটি নিয়ে আত্মপর্যালোচনার নামই হলো তাফাক্কুর। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের 'কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি'র মতো এখানেও নিজের চিন্তা ও অনুভূতির ওপর নজর রাখার কথা বলা হয়েছে। সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিদর্শনাবলি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনে এই চিন্তাশীল ব্যক্তিদের 'উলুল আলবাব' বা বিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ১৯০-১৯১ নম্বর আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এই প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা সব অবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং আসমান-জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে স্রষ্টার পবিত্রতা ঘোষণা করেন।Ultimately, সুরা বাকারার ২৬৯ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এই অমূল্য প্রজ্ঞা দান করেন এবং এটিই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় কল্যাণ।




