শহুরে জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাফিক জ্যাম। কর্মব্যস্ত মানুষ যখন বিশ্রামের সামান্য সময় পান, তার বেশিরভাগটাই কেটে যায় কোনো যানবাহনের সিটে দীর্ঘ জ্যামে আটকে থেকে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সাধারণত আমরা যেসব সমাধানের কথা ভেবে থাকি—যেমন রাস্তার সংখ্যা বা ফ্লাইওভার বাড়ানো, অথবা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি—তা অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর প্রমাণিত হয়। গণিতের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব পদ্ধতি সমস্যার সমাধান নয় বরং জটিলতা বাড়ানোর কারণ হতে পারে।
গণিতের ভাষায় একটি শহরকে বিশাল একটি গ্রাফের সঙ্গে তুলনা করা হয়। গ্রাফ থিওরি অনুসারে, শহরের বিভিন্ন স্থান হলো বিন্দু (node) এবং এদের সংযোগকারী রাস্তাগুলো হলো রেখা (edge)। গুগল ম্যাপের মতো নেভিগেশন অ্যাপগুলো এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তিয়েই কাজ করে। তবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর সবচেয়ে ভালো পথ নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয় ডাইকস্ট্রার অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদম প্রতিটি রাস্তার 'পাথ ওয়েট' (Path Weight) নির্ণয় করে, যা চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: ট্রাফিক ঘনত্ব, রাস্তার দূরত্ব, ভ্রমণের সময়কাল এবং রাস্তার অবস্থা। যে রাস্তার পাথ ওয়েট সবচেয়ে কম হবে, গুগল ম্যাপ তাকেই সর্বোত্তম রাস্তা হিসেবে সুপারিশ করে।
ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সবচেয়ে মজার এবং একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর গাণিতিক ধারণাগুলোর একটি হলো ব্রায়াসের প্যারাডক্স। এই প্যারাডক্সের মূল বক্তব্য হলো, যানজটপূর্ণ এলাকায় নতুন রাস্তা নির্মাণ করলে সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে, আবার কোনো রাস্তা বন্ধ করে দিলে জ্যাম কমে যেতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। মনে করুন, A থেকে B স্থানে যাওয়ার তিনটি রাস্তা আছে। প্রথম রাস্তাটি সবচেয়ে ছোট হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ তা ব্যবহার করে, ফলে সেখানে প্রচণ্ড জ্যাম হয়। বাকি দুই রাস্তায় গাড়ি চলাচল তুলনামূলকভাবে কম। এখন যদি এই প্রথম রাস্তার ওপর একটি ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়, তাহলে সবাই নতুন ফ্লাইওভার ব্যবহার করতে চাইবে, ফলে সেখানেই বিশাল জ্যাম তৈরি হবে। অন্যদিকে, যদি সরকার প্রথম রাস্তাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তাহলে চালকদের বাকি দুটি রাস্তার মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা সামগ্রিক ট্রাফিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং জ্যাম হ্রাস করে।
এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ১৯৯০ সালে নিউইয়র্ক সিটির অত্যন্ত ব্যস্ত '42nd Street' আর্থ ডে উপলক্ষে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সবার ধারণা ছিল শহর ভয়াবহ জ্যামে আটকে যাবে, কিন্তু বাস্তবে যানজট কমে যায়। ২০০৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শহরের কেন্দ্রে একটি ছয় লেনের হাইওয়ে ভেঙে ফেলে সেখানে পার্ক ও নদী তৈরি করা হয়েছিল, যার ফলে আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক দ্রুতগতির হয়েছিল।
জ্যামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ব্যাখ্যা করে কিউয়িং থিওরি। এই তত্ত্ব অনুসারে, একটি রাস্তায় প্রতি মিনিটে X সংখ্যক গাড়ি প্রবেশ করে এবং Y সংখ্যক গাড়ি বের হয়। যখন X-এর মান Y-এর চেয়ে বেশি হয়, তখন ধীরে ধীরে জ্যাম পেছনের দিকে বাড়তে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি মিনিটে ৫০টি গাড়ি প্রবেশ করছে কিন্তু সরু রাস্তা বা সিগন্যালের কারণে মাত্র ৪০টি গাড়ি বের হতে পারছে। এই অবস্থায় একটি গাড়ি যদি হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে মাত্র ২ সেকেন্ডের জন্য ব্রেক চাপে, তাহলে তার পেছনের ১০০টি গাড়িকেও ব্রেক চাপতে হয়, যা জ্যামকে বিশাল আকার দেয়। জ্যাম এড়ানোর জন্য ব্রেক চাপার পরিবর্তে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে হালকা ব্রেক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে রাস্তার মাঝখানে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া পারাপার নিষিদ্ধ করার পেছনেও এই কারণই কাজ করে—অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যাম কমানো।




