চারবারের প্রচেষ্টায় নিজের পছন্দের ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মো. জাবেদ হোসেন। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে তিনি সহকারী পুলিশ সুপার পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। ৪৫তম বিসিএসে নন-ক্যাডার (ইনস্ট্রাক্টর) পদে সুপারিশ পেলেও যোগদান শুরু হয়নি। ৪৬তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা শেষে ভাইভা দিলেও চূড়ান্ত ফলাফলে স্থান পাননি। শেষ পর্যন্ত ৪৭তম বিসিএসে সাফল্য অর্জন করেন তিনি।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী জাবেদের ক্যাডার পছন্দক্রমে প্রথমে ছিল বিসিএস প্রশাসন, তারপর পুলিশ, কাস্টমস, ট্যাক্স ও অডিট। স্নাতকে ৩.৮৭ সিজিপিএ অর্জন করা এই তরুণ প্রথম আলোকে জানান, প্রস্তুতির শুরুতেই তিনি বিগত বিসিএসগুলোর প্রশ্ন ও সিলেবাস বিশ্লেষণ করে নিজের শক্তিশালী ও দুর্বল দিক চিহ্নিত করেন। এরপর টপিকভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে পড়াশোনা চালিয়ে যান—নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের একটি যুগ শেষ করা, গণিতের একটি অধ্যায় ও ইংরেজির নির্দিষ্টসংখ্যক শব্দভান্ডার আয়ত্ত করা—এমন কৌশল নেন তিনি। লিখিত পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ টপিক আগে শেষ করে প্রয়োজনীয় তথ্য বইয়ে চিহ্নিত রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
প্রস্তুতির শুরুর দিকে লিখিত পরীক্ষার জন্য নোট তৈরি করাকে সবচেয়ে কঠিন কাজ বলে উল্লেখ করেন জাবেদ। তিনি ২০২১ সালের শেষ দিকে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং ২০২২ সালের শুরুতে মূল প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন। নতুন প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হতাশ না হয়ে ফোকাস ঠিক রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় বিকল্প পথ রাখার পরামর্শ দেন, যাতে বিসিএস না হলে উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা বা অন্য চাকরির মতো বিকল্প বিবেচনায় রাখা যায়। বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে একাধিক প্রকাশনীর বই না কিনে প্রিলিমিনারির জন্য একটি এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ দুটি প্রকাশনীর বই অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি। নিয়মিত পত্রিকা পড়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন জাবেদ।
এত আনন্দের মাঝেও কষ্ট আছে তাঁর। এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাবা মারা গেছেন। তিনি বলেন, ‘মা–বাবা আমাকে পড়ালেখা করানোর জন্য জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় সংগ্রাম করে গেছেন। বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াবেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার হয়েও আমাকে ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। বাবা সব সময় বলতেন, আমি যত দিন বেঁচে আছি আমার ছেলেকে পড়াব। গ্র্যাজুয়েশনের পর ওনারা কেউ আমাকে চাকরির জন্য চাপ দেননি। বলেছেন শুধু পড়তে, যদি আরও পড়তে চাই, তবু সাপোর্ট দেবেন। যখন বললাম আমি বিসিএস দেব, ওনারা আমাকে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। কখনো বলেননি আমি কবে চাকরিতে যোগ দেব, কবে কিছু করব। বাবা মাকে সব সময় বলতেন, ছেলেকে কখনো টেনশন দিয়ো না, ও যত দিন পড়তে চায় পড়ুক। নিজেদের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকলেও সেটা কখনো আমাকে বুঝতে দেননি। ধারদেনা করে সেমিস্টার ফি দিলেও আমাকে জানতে দিতেন না। আমি বেকার অবস্থায়ও বাবা তাঁর সাধ্যের বাইরে গিয়ে আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন।’
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর চরনদ্বীপের বাসিন্দা জাবেদ হোসেন। তিনি বোয়ালখালীর হাওলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বর্তমানে তিনি সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ৪৫তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ পেলেও যোগদান শুরু হয়নি এখন পর্যন্ত।



