প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন মানবসমাজ গড়ে উঠছিল, তখন প্রকৃতির পাশাপাশি বন্য প্রাণীদের ভয়ও মানুষের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বর্ষাকালে বন্যার পানি যখন চারদিক ছেয়ে যেত, তখন ক্ষেত-খামার থেকে প্রাণভয়ে বেরিয়ে আসা জীবজন্তু মানুষের বসতিতে আশ্রয় নিত। বিষধর সাপের উপদ্রব ও আকস্মিক ছোবলে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল সেই যুগের মানুষের কাছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। এই ভয় থেকে মুক্তির পথ খুঁজতেই মানুষ সাপের আরাধনায় ব্রতী হয়, যার ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে শ্রাবণ মাসের শুক্লা পঞ্চমীর মনসাপূজা।

শাস্ত্রীয় বিচারে যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে সর্পদংশন থেকে রক্ষা পাওয়ার মন্ত্রবিধির উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীকালে গৃহ্যসূত্রেও সাপকে সম্মান জানিয়ে বার্ষিক আচার পালনের নিয়মের কথা বলা হয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, দশম-একাদশ শতকে এসে মনসাদেবী বর্তমান রূপে পূজিত হতে শুরু করেন। নদীমাতৃক বাংলার ভরা বর্ষায় সর্পভীতি ও তা থেকে মুক্তির আদিম সংস্কার থেকেই এই পূজার উৎপত্তি, যা মূলত গ্রামীণ জীবনে সাপের কামড় থেকে বাঁচা এবং শস্য-সমৃদ্ধি লাভের জন্যই প্রচলিত ছিল।

পুরাণে মনসার জন্ম নিয়ে একাধিক কাহিনি প্রচলিত থাকলেও তাকে লৌকিক দেবী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, শিবের সাথে বিল্ববৃক্ষের সংস্পর্শে মনসার জন্ম, যার সাথে জড়িয়ে আছে মনসাগাছ পূজা বা বৃক্ষোপাসনার রীতি। অন্য কাহিনি মতে, দেবী দুর্গা শিবের চরিত্র পরীক্ষা করতে আদিবাসী নারীর রূপ ধারণ করে তাকে প্রলুব্ধ করেন এবং সেই সূত্রে আদিবাসী দৌহিত্রী রূপে মনসার জন্ম হয়। এই কাহিনি তাকে উচ্চবর্ণের নয়, বরং অন্ত্যজ ও অবহেলিত সমাজের মেয়ে হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইঙ্গিত বহন করে।

‘নাগ’ শব্দের দ্বৈত অর্থের দিকে ইঙ্গিত করেছেন ইতিহাসবিদরা। একদিকে এর অর্থ সাপ, অন্যদিকে আর্য-বৈদিক সংস্কৃতির বিরোধী আদিবাসী সম্প্রদায়কেও ‘নাগ’ বলা হতো, যাদের আর্যরা উভচর বলেই মনে করত। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ জহর সরকারের মতে, গাঙ্গেয় অববাহিকার জলজঙ্গলে সাপসহ নানা বন্য প্রাণীর প্রাচুর্যের কারণেই বৈদিক ও উত্তর-বৈদিক সভ্যতাকে যমুনার পূর্বাঞ্চলের জীবনধারার সাথে মানিয়ে নিতে অনেক সময় লেগেছিল। বৈদিক বিষ্ণুর মূর্তিতে তাঁকে বিপুল শেষনাগের কোলে শায়িত দেখা যায়, যেখানে সেই মহাসর্পই ফণা তুলে তাঁর মাথায় ছাতা ধরে থাকে; অন্যদিকে শিবের কণ্ঠেও বাসুকির অবস্থান। অর্থাৎ একসময়ের ভয়ংকর নাগেরা কীভাবে ক্রমশ বৈদিক ও অবৈদিক উভয় দেবতার সাথেই জড়িয়ে গেল, তা ভারতীয় সভ্যতার পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসকে মিলিয়ে দেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।

বাংলার গ্রামে গ্রামে শিব ও চণ্ডীর মতোই মনসার নামেও থান বা মন্দির স্থাপিত হয়েছে। সর্পমূর্তি, মনসামূর্তি, হংসবাহিনী মূর্তি কিংবা অষ্টনাগসহ নানা রূপে তিনি পূজিত হন। দুধ, কলা, সন্দেশ, ফুল ও চাল দিয়ে পূজা করা হয়; অনেক জায়গায় হাঁস, মুরগি বা ছাগল বলির প্রচলনও রয়েছে। বাড়ির উঠানে মনসার থানের আলপনার উপর দিয়ে যদি বাস্তুসাপ ঘুরে যায়, তবে ভক্তরা তা পূর্বপুরুষের আবির্ভাব বলে বিশ্বাস করেন, যা এক প্রাগৈতিহাসিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় মঙ্গলকাব্য ‘মনসামঙ্গল’-এ দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার ও পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি বর্ণিত। শিবভক্ত চাঁদ সদাগর মনসার পূজা করতে অস্বীকার করায় তার পুত্র লখিন্দরকে সাপের কামড়ে মারা হয়। পুত্রবধূ বেহুলা স্বামীর জীবন ফিরে পেতে মনসার পূজা করেন এবং অবশেষে চাঁদ সদাগরও পূজা করতে বাধ্য হন। সাহা নামের এক শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের গৃহে জন্ম নেওয়া বেহুলার কারণে বণিক পরিবারগুলোতে মনসাপূজা অত্যন্ত ধুমধামের সাথে পালিত হয় এবং এই ঘটনার মাধ্যমেই উচ্চশ্রেণির সমাজে পূজাটি ব্যাপকভাবে প্রচার লাভ করে। শ্রাবণ মাসজুড়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে মনসাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সারারাত ধরে পালাগান ‘সয়লা’-তে পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গলের গান গাওয়া হয়।