কোনো ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নেই, নেই কোনো সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বা নিজস্ব সম্পত্তি। তবুও বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন টেক্সাসের বৌদ্ধ ভিক্ষু ভেনারেবল ভিক্ষু পান্নাকর। ফোর্ট ওয়ার্থের হুওং ডাও ভিপাসনা ভবনা সেন্টারের উপ-মঠাধ্যক্ষ এই ভিক্ষু তার অসাধারণ শান্তি পদযাত্রার জন্য এখন আলোচিত। চলতি বছরের অক্টোবরে ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে শেষ হওয়া ৩,৭০০ কিলোমিটারের এই পদযাত্রায় তিনি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মিলিত হন। লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহরের চত্বরে তাঁর ধ্যান ও দয়া-করুণার বক্তৃতা শুনতে ভিড় জমায় নানা শ্রেণির মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে লাইভ অনুসরণ করেছেন মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই পদযাত্রা তাঁকে একটি বিভক্ত দেশে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও ঐক্যের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে দালাই লামা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং প্রয়াত থিচ নাট হান-এর তুলনা টানছেন।

পান্নাকর অবশ্য এই সুনাম নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান না। তিনি বলেন, 'ভিক্ষুর জন্য fame বলে কিছু নেই। আমি শান্তি, প্রেম ও করুণা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য হাঁটার ব্রত নিয়েছি। এটাই আসল বিষয়।' থেরবাদ বৌদ্ধ মতানুসারে তিনি কঠোর 'বিনয়' নিয়ম মেনে চলেন। তার মানে কোনো সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট নেই, ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেই, অর্থ স্পর্শ করা নেই, এবং ব্রহ্মচর্য ও সরলতা পালন। তিনি দুপুরের পর খাবার খান না এবং মন্দিরের সচিব চিন লে-র মতে, তিনি বসে বসেই ঘুমান—যা থেরবাদ ভিক্ষুদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে কিছু ভিক্ষু গভীর মননশীলতার জন্য এটি করেন।

পান্নাকরের জন্ম ১৯৮১ সালে ভিয়েতনামের ডাক লাকে, দশ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁর পরিবার নামেমাত্র বৌদ্ধ ছিল। ১৯৯৭ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত হন এবং টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতক ডিগ্রি নেন। প্রথম বৌদ্ধধর্মের সংস্পর্শে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে মন্দিরের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প ও যুব নেতৃত্বের মাধ্যমে। ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ার ছেড়ে তিনি নবীন ভিক্ষু হন এবং ২০১০ সালে তাঁর গুরু ভেনারেবল রতনগুণের কাছ থেকে পূর্ণ দীক্ষা নেন। তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো একক ঘটনা ছিল না, বরং প্রিয়জনের কষ্ট ও মানুষে মানুষে প্রতিযোগিতা দেখে তিনি সবকিছু 'মিথ্যে' মনে করতেন।

মন্দিরের সচিব চিন লে স্মরণ করেন, পান্নাকরের বাবা-মা প্রথমে খুব কেঁদেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁরা মেনে নেন। পান্নাকর দ্রুত শিখতেন, মন্দিরের ক্যাম্পাসে ল্যান্ডস্কেপিং, রান্নাঘর, ভিক্ষুদের বাসস্থান এবং স্মৃতিহল নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেন। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তিনি গুরুদের নির্দেশে মিয়ানমারে গিয়ে ভিপাসনা ধ্যানের অনুশীলন করেন। কোভিড মহামারি শুরু হলে ফোর্ট ওয়ার্থে ফিরে তিনি খাদ্য বিতরণের আয়োজন করেন। মন্দিরের সদস্য আমান্ডা ফান বলেন, 'তিনি বিরল মানুষ। তিনি করুণা, প্রজ্ঞা ও দয়ার মূর্ত প্রতীক—একজন বোধিসত্ত্ব।'

২০২২ সালের শেষ দিকে পান্নাকর প্রায় ১০০ ভিক্ষুর সঙ্গে নেপালের লুম্বিনী থেকে ভারতের বুদ্ধগয়া, সারনাথ ও কুশিনগর পর্যন্ত বুদ্ধের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ৩,৩৮০ কিলোমিটার তীর্থযাত্রায় অংশ নেন। তাঁরা খালি পায়ে হাঁটতেন, দিনে একবার খেতেন এবং খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতেন। পান্নাকর বলেন, 'বুদ্ধের শিক্ষা ত্রিপিটক থেকে শিখেছি, কিন্তু এই হাঁটার মাধ্যমে আমি তা অনুভব করেছি।' এই যাত্রাতেই তাঁর জীবনে আসে আলোক নামের একটি কুকুর। পালি ভাষায় 'আলোক' মানে আলো। কুকুরটি এখন তাঁর আন্দোলনের ম্যাসকট।

আগে বুদ্ধগয়ার বোধি গাছের নিচে এক দর্শনে পান্নাকরের মনে হয় পাথরের স্তূপ তৈরি করে বুদ্ধের শিক্ষা সংরক্ষণ করা। সাত বছর পর তিনি গুরু রতনগুণের অনুমতি নিয়ে ২০ কোটি ডলারের 'ধম্মচেতিয়া' প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন—৮৪০টি স্তূপে ১০ ভাষায় বুদ্ধের শিক্ষা খোদাই করা হবে, যা ৪,০০০ বছর টিকবে। ২০২২ সালের আন্তর্জাতিক ভেসাক অনুষ্ঠানে তিনি শপথ নেন যে এই কাজ শেষ করতে না পারলে তিনি পুনর্জন্ম নিয়ে তা সম্পন্ন করবেন।

রাজনীতি থেকে দূরে থাকার সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পান্নাকর। সিনিয়র থেরবাদ ভিক্ষু ভিক্ষু বোধি আশা করেন তিনি ভবিষ্যতে দারিদ্র্য, গৃহহীনতা ও জলবায়ুর মতো বিষয়ে কথা বলবেন। তবে অপর ভিক্ষু অজহান নিসাভো মনে করেন, রাজনীতি এড়িয়ে চলাই সঠিক ছিল, কারণ 'একজন ভিক্ষুর দর্শন মানুষকে দুঃখ থেকে মুক্তির পথ দেখায়। রাজনীতি আনলে দেশের অর্ধেক মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।'