সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন চোখ রাখলেই চোখে পড়ে ভ্রমণভিডিও বা ট্রাভেল ভ্লগিংয়ের ছড়াছড়ি। তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ প্রবণতা। মেঘের ওপর সেলফি তোলা, পাহাড়ি ঝরনার ধারে লাইভ ভিডিও করা কিংবা অচেনা জনপদের খাবারের রিভিউ দেওয়া—এসব নিয়েই যেন মেতে উঠেছে সবাই। তবে একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, মানুষের ভ্রমণের মৌলিক উদ্দেশ্য বদলে যাচ্ছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ বা মানসিক প্রশান্তির চেয়ে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে লাইক, ভিউ ও ভার্চুয়াল জগতে নিজের প্রতিপত্তি প্রদর্শন। এই প্রদর্শনীপ্রবণতা ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের নিয়ত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য বড় একটি সংকট সৃষ্টি করেছে বলে মত দিচ্ছেন ইসলামি চিন্তাবিদেরা।

ইসলামি জীবনদর্শনে ভ্রমণকে কখনোই নিরুৎসাহিত করা হয়নি। বরং স্রষ্টার সৃষ্টি অবলোকন ও তা থেকে শিক্ষা নেওয়াকে অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কোরআনে বারবার পৃথিবী ভ্রমণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২০) আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তবে কি তারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি, যাতে তাদের অন্তরসমূহ বুঝতে পারত?’ (সুরা হজ, আয়াত: ৪৬) ইসলামি দর্শন অনুযায়ী, ভ্রমণ মানুষের অহংকার দূর করার ও নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করার একটি মাধ্যম। বিশাল পাহাড় বা অফুরন্ত সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে একজন মুমিন আল্লাহর মহত্ত্ব স্মরণ করে বিনয়ী হয়ে ওঠে—এটিই ছিল ইসলামের চিরায়ত শিক্ষা।

আধুনিক ট্রাভেল ভ্লগিংয়ের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক সমস্যা হলো এটি মানুষের মনের অজান্তেই ‘রিয়া’ বা লোকদেখানোর মানসিকতা তৈরি করে। ক্যামেরার লেন্স সবসময় চালু থাকলে মানুষের মনোযোগ প্রকৃতির চেয়ে নিজের অ্যাঙ্গেল, লাইটিং ও ভিডিওর স্ক্রিপ্টের দিকে বেশি থাকে। কেউ যখন কোনো সুন্দর জায়গায় যায়, তখন তার মূল চিন্তা যদি হয় ‘মানুষকে কীভাবে দেখাব ও বেশি ভিউ পাব’, তাহলে সেই ভ্রমণের আধ্যাত্মিক গভীরতা নষ্ট হয়ে যায়। ইসলামে যেকোনো কাজের ভিত্তি হলো নিয়ত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১) কোনো বৈধ কাজ যদি কেবল মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা মনকে কলুষিত করে। তিনি লোকদেখানো ইবাদতকে ‘ছোট শিরক’ বা রিয়া বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ওপর সবচেয়ে বেশি যা ভয় পাই, তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘তা হলো রিয়া (লোকদেখানো আমল)।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৮১) বর্তমান ভ্লগিং সংস্কৃতি মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে প্রকাশ্য প্রদর্শনীতে পরিণত করে আত্মিক বিনয় নষ্ট করে এবং অহংকার বাড়ায়।

ট্রাভেল ভ্লগিং আরেকটি নেতিবাচক সামাজিক প্রভাব ফেলে। এটি সমাজে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা ও অপচয়ের মানসিকতা তৈরি করে। ভ্লগাররা বিলাসবহুল হোটেল, দামি রেস্তোরাঁ ও রাজকীয় ভ্রমণের দৃশ্য দেখিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত তরুণদের মনে হতাশা ও অসন্তুষ্টি জন্ম দেয়। অনেকে কেবল ভ্লগ বানানোর লোভে বা স্ট্যাটাস ধরে রাখতে গিয়ে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে অপব্যয় করেন। কোরআনে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে এবং অহংকারবশত অপব্যয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭) ভ্রমণ যদি কৃতজ্ঞতা বাড়ানোর বদলে শ্রেণিবৈষম্য ও অহংকারের প্রদর্শনী তৈরি করে, তবে তা আর কল্যাণের মাধ্যম থাকে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যা ইচ্ছা খাও ও পরিধান করো, যতক্ষণ না তা অপচয় ও অহংকারের রূপ নেয়।’ (সহিহ বুখারি)

আধুনিক পর্যটকেরা এখন আর চোখ দিয়ে নয়, বরং ক্যামেরার লেন্স দিয়ে বিশ্ব দেখে। লেন্সের পেছনের অবিরাম খাটুনি মানুষকে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ও প্রশান্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ইসলাম মানুষকে ‘তাফাক্কুর’ বা গভীর অনুধাবনের তাগিদ দেয়। যখন কেউ ক্যামেরার বোতাম টেপায় ব্যস্ত থাকে, তখন সে আল্লাহর সৃষ্টির গম্ভীর নীরবতা ও আধ্যাত্মিক বার্তা মন দিয়ে শোনার সুযোগ পায় না। মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা ভ্রমণের সময় পথের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে তাসবিহ ও তাকবির পাঠ করতেন এবং আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৯৩)। প্রকৃতির সেই পাঠশালা থেকে বর্তমান প্রজন্ম কেবল কয়েক সেকেন্ডের রিলস বা শর্টস সংগ্রহ করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভ্রমণ করা, ছবি তোলা বা নিজের আনন্দের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু লাইক, কমেন্ট ও ভিউয়ের তীব্র মোহ যখন ভ্রমণের মূল আত্মিক উদ্দেশ্যকে গ্রাস করে, তখন তা এক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধিতে পরিণত হয়। তরুণদের বুঝতে হবে যে জীবনের প্রতিটি সুন্দর মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করে অন্যকে দেখানোর মধ্যেই সার্থকতা নেই। কিছু মুহূর্ত স্রষ্টা ও নিজের মধ্যে একান্তে রেখে দেওয়ার মধ্যেও অপার্থিব আনন্দ লুকিয়ে আছে। লোকদেখানোর চাকচিক্যময় সংস্কৃতি পরিহার করে বিনয়, শিক্ষা ও কৃতজ্ঞতার নিয়তে ভ্রমণ করলেই কেবল প্রকৃত আধ্যাত্মিক ও মানসিক কল্যাণ লাভ সম্ভব।