বর্তমানে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার তত্ত্বাবধানে গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। দেশটির চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে এই অবস্থায় রাখা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর তাঁকে তেহরানের বাসভবন থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাঁকে জনসমক্ষে দেখা গেলেও তাঁর চারপাশে নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি ছিল বলে নজরে এসেছে।
এই চাঞ্চল্যকর পরিকল্পনার সূত্রপাত ঘটে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি দেশটির সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি অস্বাভাবিক প্রস্তাব পান। তাঁকে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি সম্মেলনের আয়োজন করতে হবে এবং সেখানে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। অধ্যাপক ডেলি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এই সম্মেলন আসলে একটি অজুহাত; এর আড়ালে বুদাপেস্টে ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করবেন আহমাদিনেজাদ। নিজের সুনাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও তিনি রাজি হন, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আহমাদিনেজাদকে নিজেদ�র পক্ষে আনার কৌশল নিয়েছিল। তাঁকে এমন একটি গোয়েন্দা সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনা ছিল, যাকে উপযুক্ত সময়ে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান ডেভিড বারনিয়া নিজে বুদাপেস্টে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর কিছুদিন পরই মোসাদ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে (সিআইএ) জানায় যে তারা আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হাইমান ‘ফায়ারিং লাইন’ অনুষ্ঠানে বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় ‘খুবই ব্যতিক্রমধর্মী’ ধারাবাহিক কয়েকটি বিশেষ অভিযানের কথা ছিল এবং আহমাদিনেজাদ সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
কবে থেকে এই যোগাযোগ শুরু হয় তা নিশ্চিত নয়, তবে ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেন ২০২৩ সালে গুয়াতেমালায় পরিবেশ বিষয়ক একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় প্রাথমিক সংযোগ ঘটে। ওই সফর প্রায় বাতিল হয়ে যায় যখন তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধা দেয়, তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যেতে সক্ষম হন। পরের বছর তিনি প্রথমবার হাঙ্গেরি সফর করেন এবং বুদাপেস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনের আড়ালে মোসাদ প্রধানের সঙ্গে দেখা করেন। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে পুনরায় বুদাপেস্টে যান আহমাদিনেজাদ। ওই সফরে আইআরজিসির দেহরক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর একটি কালো প্যুজো গাড়ি এসে আহমাদিনেজাদকে তাঁর বাসভবন থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়। গাড়িটি মোসাদের সদস্যরা চালাচ্ছিলেন বলে ঘটনায় অবগত সূত্র জানিয়েছে। তাঁকে ইরানের অভ্যন্তরে একটি গোপন নিরাপদ আস্তানায় রাখা হয়। তবে এই তড়িঘড়ি উদ্ধার অভিযানে আহমাদিনেজাদ ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁকে ক্ষমতায় বসানোর ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়েও তাঁর সংশয় তৈরি হয়। এরপর তিনি কীভাবে সেই আস্তানা ছেড়েছিলেন, তা এখনো অস্পষ্ট।
প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আহমাদিনেজাদ ইসরায়েলবিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন, কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ার পর তাঁর বক্তব্য ও চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তিনি ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো সংস্কারকের ভূমিকা পালন করতে চান এবং ক্ষমতায় এলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে। তাঁর সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি বলেন, ‘আহমাদিনেজাদ অর্থের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্যই এই পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান।’ ইসরায়েলের পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ইরানি কুর্দি যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইরানে প্রবেশ করানো, কিন্তু সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে এবং তাঁর অবস্থান এখনো নিশ্চিত নয়।




