পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদের মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে ইলিশ ধরার মৌসুমেও সাগরে যেতে পারছেন না অসংখ্য জেলে ও মাঝিমাল্লা। স্থানীয় বরফকলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ট্রলারে মাছ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বরফ সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলেদের জীবন-জীবিকার ওপর।
আক্রান্ত জেলেদের একজন, ৪০ বছর বয়সী নাসির খান জানান, চার দিনের সমুদ্রযাত্রায় একটি ট্রলারে সাধারণত ১২০ ক্যান বরফ প্রয়োজন হয়। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে কোনো বরফকল থেকেই পর্যাপ্ত বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। সংকট পুঁজি করে বরফের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে; ১৫০ টাকার প্রতিটি ক্যান এখন ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকাশমূল্যের পাশাপাশি আগাম অনুরোধ জানালেও বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দ্বিগুণ খরচে বরফ কিনে সাগরে গিয়ে লাভ করা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগে প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার জেলে সাগরে যেতেন, কিন্তু বর্তমান বরফসংকটে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ জনে। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ জেলে এখন কাজ করতে পারছেন না। মৎস্যবন্দর ও আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাসের মতে, প্রতিদিন গড়ে ২০০টি ট্রলার সাগরে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে বরফের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে মাত্র ৩০ থেকে ৬০টি ট্রলার যাত্রা করতে পারছে। গত ১৫ দিনের এই পরিস্থিতি জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার এবং মৎস্য ব্যবসায়িসহ প্রায় এক লাখ মানুষকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট, কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮৫ মেগাওয়াট। এই ৪৫ মেগাওয়াটের ঘাটতির কারণে চাহিদার মাত্র ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরের ৩৬টি বরফকলে বর্তমানে দুই ঘণ্টা পর দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। বরফ তৈরির প্রক্রিয়ায় টানা ১২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। গাজী আইস প্ল্যান্টের মালিক এবং মহিপুর বরফকল মালিক সমিতির সভাপতি গাজী মজনু মিয়া জানান, বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিবারই প্রথম থেকে শুরু করতে হচ্ছে, ফলে বিপুল বিদ্যুৎ খরচ হলেও উৎপাদন হচ্ছে সামান্য।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার ক্যান বরফের প্রয়োজন হলেও উৎপাদন হচ্ছে তার এক-তৃতীয়াংশ। কোনো কোনো কল দিনে সর্বোচ্চ ২০০ ক্যান আর কোনোটি মাত্র ৩০-৪০ ক্যান বরফ তৈরি করতে পারছে। এই সংকটে কেবল জেলেরা নয়, বরফকলের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০০ শ্রমিক এবং ট্রলারে বরফ পরিবহনের কাজে নিয়োজিত আরও ৫০০-৬০০ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। শ্রমিক মহাসীন মিয়া আক্ষেপ করে জানান, আগে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা আয় করলেও এখন কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বরফকল মালিকরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল কাশেম জানিয়েছেন, বরফকল মালিকদের অনুরোধে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই কলগুলো সচল রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




