বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ১৯০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার বেহালায় জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বভারতীর ছাত্র ও পরবর্তীকালে সেখানকার শিক্ষক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের গুরু ছিলেন তিনি; সত্যজিৎ তাঁর জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘দ্য ইনার আই’। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে চোখের একটি ভুল অস্ত্রোপচারে দৃষ্টিশক্তি হারান এই গুণী শিল্পী। তবু শান্তিনিকেতনের কোপাই নদীসহ প্রাকৃতিক দৃশ্যকে তিনি অসাধারণভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।
শিল্পীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজশাহীর গোদাগাড়ী রেল কলোনির সঙ্গে। বালক বয়সের কিছু দিন সেখানে কেটেছিল তাঁর। ভাই বনবিহারী মুখোপাধ্যায় ওই কলোনির চিকিৎসক ছিলেন। ভাইয়ের সঙ্গে মাকেও সেখানে আসতে হয়েছিল; সেই সুবাদে ছোট বিনোদবিহারীরও উপস্থিতি ঘটে। শতবর্ষ আগের সেই দিনের স্মৃতি তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর শেষজীবনের গ্রন্থ ‘চিত্রকর’-এ। ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর কলকাতা থেকে অরুণা প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করে। লেখকের অঙ্কিত স্কেচের ভিত্তিতে প্রচ্ছদ তৈরি করেন সত্যজিৎ রায়।
বইয়ে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন খড়ের ছাউনিওয়ালা বিশাল বাংলোর। উঁচু পাঁচিল-ঘেরা উঠোন, বাঁদিকে ও ডানদিকে খড়ের ঘরের সারি—রান্নাঘর, ভাঁড়ার, গুদাম ও চাকরের থাকার ব্যবস্থা সবই ছিল সেখানে। ঘরের বারান্দা থেকে চোখে পড়ত মানকচুর ঝাড়। আগে কখনো খড়ের ঘরে থাকেননি, মানকচুর গাছও দেখেননি—এই নতুন পরিবেশ শিশুটির মনে গভীর ছাপ ফেলে।
বাংলোর পাশে ছিল মস্ত বাগান। একদিকে কলাগাছের ঝাড়ে প্রায় অন্ধকার হয়ে থাকত, অন্যদিকে আগাছায় ভরা অংশে মাঝে মাঝে বিলিতি বেগুনের গাছ চোখে পড়ত। বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে লম্বা হয়ে উঠেছিল বড় বড় গাছ, যেন মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সবুজের এক প্রাচীর। শিশু বিনোদবিহারীর দিন কাটত এই প্রকৃতির মাঝে। তিনি লিখেছেন, সকালের পর দাদা হাসপাতালে যেতেন, মা রান্নাঘরের দিকে যেতেন, আর তিনি একা বাইরে ঘুরে গাছ দেখতেন—মানুষের দেখা খুব কম মিলত।
বাড়িতে থাকা রাঁধুনি মহাদেব ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন পরিবারের সঙ্গে মিশে যাওয়া মানুষ। মহাদেব কখনোই সমস্তিপুর ও গোদাগাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও যাননি। মায়ের সময় কাটত এদের সঙ্গে গল্প করে ও রান্না করে। কলকাতার গল্প শুনলে প্রায়ই মহাদেব বিশ্বাস করতে চাইতেন না; তিনি বলতেন, সমস্তিপুরের চেয়ে বড় শহর আর নেই।
বিকেলে কয়েকখানা চেয়ার বাইরে রাখা হতো। লোকজনের আগমন ছিল বিরল। প্রায় প্রতিদিনই একজন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আসতেন; আধা বাংলা, আধা হিন্দিতে কাজের কথা বলে যেতেন। চিকিৎসাসূত্রে একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। বিকেলবেলা পুলিশ অফিসার, দাদা ও বিনোদবিহারী—তিনজন বসে চুরি-ডাকাতির গল্প করতেন। সন্ধ্যা নামলে লন্ঠন হাতে একজন লোক আসত। পুলিশ ইন্সপেক্টর বিদায় নিতেন। তখন দাদা ভাইকে পায়চারি করতে করতে তারা দেখাতেন—চশমার ভেতর দিয়ে কালপুরুষ, গ্রেট বেয়ার ইত্যাদি। বাইরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে লন্ঠন জ্বলে উঠলে তারা ভেতরে যেতেন।
বিনোদবিহারীর লেখায় বারবার সমস্তিপুর নামটি এসেছে। বর্তমানে গোদাগাড়ীতে ৪১৫টি গ্রাম রয়েছে, কিন্তু ঠিক সেই নামের কোনো গ্রাম পাওয়া যায় না; তবে সমাসপুর ও সন্তোষপুর নামে গ্রাম আছে। পোস্ট-অফিস থেকে চিঠিপত্র নিয়ে বাজার হয়ে বাড়ি ফিরতেন তিনি। বাজারে বড় বড় চিতল, রুই, কাতলা মাছ পাওয়া যেত—দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকার মধ্যে যেকোনো একটি কেনা যেত। যদিও ‘বাজারের ভিড়’ কথাটি প্রচলিত, গোদাগাড়ীর বাজারে তেমন ভিড় দেখা যেত না। মহাদেব বলতেন অনেক লোক আছে, কিন্তু বিনোদবিহারী বেশি ভিড় কোনোদিন দেখেননি।
হাসপাতালে বেড়াতে যেতেন তিনি। খড়ের ঘরে ডাক্তার বসতেন, পাশে ছেঁচা বেড়া দেওয়া কম্পাউন্ডারের ঘর, টেবিল ও শিশি-বোতল। হাসপাতালে রেখে যাদের চিকিৎসা করা হতো, তাদের জন্য আর একটি লম্বা খড়ের ঘর ছিল।
গোদাগাড়ীতে মানুষ কম দেখলেও সাপ অনেক দেখেছিলেন। থাকতে থাকতে সেই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। বাইরে বেরিয়ে মা আর বলতেন না, ‘এ কোন জঙ্গলে এলাম।’ কিন্তু একদিন দাদা হাসপাতাল থেকে ফিরে বললেন, ‘আমাদের বনবাস শেষ হলো। বদলির খবর এসেছে।’ জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা হলো। কলকাতার শানবাঁধানো শহরে ফিরে এলেন। বাড়িতে মালপত্র নামানোর সঙ্গে নামানো হলো স্পিরিটভরা বড় একটি কাচের জার, যার ভেতরে ছিল মুঠোপরিমাণ চওড়া দুটি গোখরো সাপের মাথা। জারের ওপর লেবেল দেওয়া ছিল—উপরে লেখা: ‘গোদাগাড়ির স্মৃতি’।
বর্তমানে রেল কলোনির জমির মালিকানা এখনো রেল কর্তৃপক্ষের হাতেই রয়েছে। তবে এলাকার লোকজন নিজের মতো বাড়িঘর ও দোকানপাট গড়ে তুলেছে। এসবের ভিড়ে ঢাকা পড়েছে বিনোদবিহারীর জঙ্গলাকীর্ণ কলোনির সেই স্মৃতি।




