শ্রাবণ মাসের এই সময়ে বরিশালের বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি পালপাড়ায় একটি ছোট কর্মশালায় মৃৎশিল্পী সমীর পাল ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। মেঘলা বিকেলে সেখানে মিটমিটে জ্বলা বৈদ্যুতিক বাতির নিচে সারি সারি সাদা মাটির ঘট সাজানো। কোনোটি খড়িমাটির প্রলেপে ঢাকা, আবার কোনোটিতে হলুদ রঙে দেবীর প্রথম রেখা আঁকা। মেঝেতে বসে হাতে সরু তুলি নিয়ে তিনি মনসা দেবীর মুখ, কালো কেশরাশি, লাল বসন ও মাথার ফণা তোলা সাপের ছবি ফুটিয়ে তুলছেন। মনসাপূজার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মনসাঘট তৈরির কাজে তিনি এখন পুরোপুরি নিমগ্ন।

বাংলার লোকবিশ্বাসে মনসা সর্পদেবী হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা, পারিবারিক মঙ্গল, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় তাঁর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বরিশাল অঞ্চলে এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনসামঙ্গল কাব্য এবং কবি বিজয় গুপ্তের স্মৃতি। আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলায় বিজয় গুপ্তের স্মৃতিবিজড়িত মনসামন্দিরে শ্রাবণ মাসে মনসামঙ্গলের পদাবলি পাঠ ও পূজার আয়োজন হয়ে থাকে। স্থানীয় লোকসংস্কৃতিতেও মনসাপূজা ও মনসামঙ্গল কাব্যের নানা উপাদান মিশে আছে। বাংলার মানুষের কাছে মনসার সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিচয় এসেছে মনসামঙ্গল কাব্যের মাধ্যমে। চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে দেবী মনসার দ্বন্দ্ব, লখিন্দরের সর্পদংশনে মৃত্যু এবং মৃত স্বামীকে ভেলায় নিয়ে বেহুলার দেবলোকে যাত্রার কাহিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত। এই কাহিনি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ নয়, বরং বাংলা সাহিত্য, সংগীত, পালাগান ও লোকনাট্যেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

কলসকাঠি পালপাড়ায় একসময় প্রায় প্রতিটি পাল পরিবারই মনসাঘট তৈরি করত। এখন প্রায় বিশটি পাল পরিবারের মধ্যে কেবল সমীর পালই এই বিশেষ ঘট নির্মাণ করছেন। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা নারায়ণ চন্দ্র পালের কাছ থেকে তিনি এই শিল্প শেখেন। পড়াশোনার ফাঁকে বাবার কাজে সহযোগিতা করতেন। প্রায় দেড় দশক আগে বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব তাঁর ওপর পড়ে। ততদিনে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। এরপর পড়াশোনা ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে মৃৎশিল্পের কাজে যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর সংসারে রয়েছেন স্ত্রী অনিমা, দেড় বছরের কন্যা শ্রেয়সী এবং বৃদ্ধ মা পুষ্প রানী।

স্থানীয় চারুকলা সংগঠক সুশান্ত ঘোষ বলেন, বরিশালের ঘটের গঠন অন্যান্য এলাকার চেয়ে ভিন্ন। এর সঙ্গে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীকী ধারণা যুক্ত রয়েছে। স্থানীয় মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে এই গঠন গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত ৩০ জুলাই, পূজার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, পালপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা। কোথাও কাঁচা মাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও ছাঁচে ঘট তৈরি হচ্ছে। নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ—প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কাজে নিযুক্ত। কেউ মনসার প্রতিমা গড়ছেন, আবার কেউ লক্ষ্মী বা সরস্বতীর মূর্তি নির্মাণ করছেন। তবে চোখে পড়ে সারি সারি মনসাঘট। স্থানীয় লোকজন জানান, একসময় পালপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই মনসাঘট তৈরি করত। এখন হাতে গোনা কয়েকজন কারিগরই এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

এবার সমীর পাল প্রায় দেড়শটি মনসাঘট তৈরি করছেন। প্রতিটির দাম তিনশত থেকে সাড়ে তিনশত টাকা। একটি ঘট তৈরিতে ব্যয় হয় একশত থেকে দেড়শত টাকা। তিনি জানান, আগের মতো চাহিদা আর নেই। হিসাব করলে এই কাজ করে সংসার চালানো কঠিন। তবু তিনি এ পেশা ছাড়তে পারেননি। তাঁর ভাষায়, এই কাজই তো তাঁদের পরিচয়। একসময় যেখানে বহু পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল, সেখানে এখন কেবল তিনিই এই বিশেষ ঘট নির্মাণ করছেন। সমীরের হাতে তৈরি প্রতিটি মাটির ঘট পূজার পর হয়তো কোনো ঘরের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ঘট তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দক্ষতা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে কিনা—এখন সেই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।