পারস্পরিক প্রতিরক্ষার এমন একটি অঙ্গীকার, যেখানে যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে—এই ধারণাটি পশ্চিমা জোট ন্যাটোর ‘৫ নম্বর অনুচ্ছেদ’-এর সঙ্গে তুলনীয়। গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে ঠিক এই প্রতিশ্রুতিই রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ এই চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে বাস্তবে কি এই চুক্তি থেকে তেমন কোনো জোটের জন্ম নিতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

দীর্ঘ এক বছরের আলোচনার পর চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তিতে সই করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। ইসলামের পবিত্রতম নগরী মক্কায় চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তাও বহন করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সামরিক ভারসাম্যে এর প্রভাব কতখানি হবে, তা বোঝার জন্য চুক্তির পটভূমি ও বিভিন্ন সমীকরণ বিশ্লেষণ জরুরি।

চুক্তির জন্ম কিন্তু কোনো শান্তিপূর্ণ সময়ে হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি এবং তেল অবকাঠামোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়াতে বাধ্য হয় রিয়াদ; ইয়ানবু বন্দর দিয়ে সৌদি তেলের রপ্তানি দৈনিক ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছে। এই স্পর্শকাতর সমুদ্রপথেই হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। গত ২০ জুলাই তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে। এমনকি চুক্তি সইয়ের মাত্র দুই দিন পর, ৯ আগস্ট, ইরান-সমর্থিত হুতিরা জাজানে সৌদি আরামকোর একটি শোধনাগারে ড্রোন হামলার দাবি করে। অর্থাৎ, এই চুক্তি কোনো কল্পিত হুমকি মোকাবিলায় নয়; বরং আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকির চূড়ান্ত মুহূর্তে এটি চূড়ান্ত হয়েছে।

মার্কিন সুরক্ষা নিয়ে রিয়াদের গভীর হতাশা এই চুক্তির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যখন ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সৌদি তেল স্থাপনা রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছিল, তখনই বিকল্প প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা প্রকট হয়ে ওঠে। ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সহযোগিতার এই উদ্যোগকে কেউ কেউ উপসাগরের ‘প্ল্যান বি’ হিসেবেও দেখছেন। আগে নিরাপত্তার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান ভরসা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; এখন সেই জায়গায় আঙ্কারা, রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে উঠছে।

তবে ‘মুসলিম ন্যাটো’ অভিধা সত্ত্বেও ন্যাটোর মতো কঠোর সামরিক জোট এখনই তৈরি হচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ন্যাটোর মতো এখানে একটি নির্দিষ্ট ও অভিন্ন শত্রু নেই। সৌদির প্রধান উদ্বেগ ইরান, তুরস্কের মূল অগ্রাধিকার সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর, আর পাকিস্তানের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারত। কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা গবেষক ড. অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগের মতে, অভিন্ন শত্রুর অনুপস্থিতিতে ন্যাটোর কাঠামোর বদলে একটি নমনীয় ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেল গড়ে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রের ‘হাব’ বা মূল শক্তি হিসেবে কাজ করবে সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের সমঝোতা, আর কুয়েত, বাহরাইন বা কাতারের মতো ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি বড় সামরিক দায়িত্ব না নিয়ে আলাদা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ‘স্পোক’ হিসেবে যুক্ত থাকবে।

চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে তৈরি নয় বলে দাবি করেছেন এরদোয়ান ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী; তারা বলেছেন, এই কাঠামো সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরানকে বাদ রেখে এই চুক্তি গঠন মূলত তেহরানকে ঘিরে একটি নিরাপত্তা-সমীকরণ তৈরি করছে। তেহরান অবশ্য এই কাঠামোকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না; একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি সৌদির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। লোহিত সাগরেও একই চিত্র। গত ৩০ জুলাই সৌদি নেতৃত্বে গঠিত ১৪ দেশের নৌ প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ থাকলেও ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সই করেনি। সেখানেও ইরানকে দূরে রাখা হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে উদ্যোগগুলো ভিন্ন মনে হলেও ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় সমীকরণ হয়ে কাজ করছে।

এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি অর্থায়নে তুরস্কের তৈরি উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পাকিস্তানের হাতে পৌঁছালে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামরিক অবস্থানের ওপর তা চাপ তৈরি করতে পারে। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের পাকিস্তানের পাশে থাকাও দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ। এই নতুন সামরিক মেরুকরণ ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর চুক্তিটির প্রভাব তারা পর্যালোচনা করছে। এর আগে ৬ আগস্ট ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ফোন করে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ও দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে কথা বলেন।

সবশেষে, পাকিস্তানের অবস্থানই এই চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মিডল ইস্ট মনিটরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক থাকলেও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং দেশের উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-সমীকরণ। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো পাকিস্তানের জন্য বড় ঝুঁকি। ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে রিয়াদ সেনা সহায়তা চাইলে পাকিস্তানের সংসদ সর্বসম্মতভাবে ‘নিরপেক্ষ’ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা এই ঝুঁকিরই প্রমাণ। মক্কা চুক্তির কঠোর প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার এখন পাকিস্তানকে এক নতুন অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছে। ভবিষ্যতে সৌদির তেল স্থাপনায় হামলা হলে পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে, নাকি আগের মতো নিরপেক্ষ থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মক্কা চুক্তির প্রকৃত কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা।