জীবনে যখন বিপদ এসে ঘিরে ধরে—চাকরি হারানো, সংসার ভাঙা, অসুস্থতা কিংবা ব্যবসায় ধস—তখন মানুষের মনে একমাত্র প্রশ্ন জাগে: কাকে ডাকব? বন্ধু-বান্ধব সাহায্য করতে ব্যর্থ, নিজের চেষ্টাও বিফল। এমন মুহূর্তে কোরআন খুলে দেখা যেতে পারে নবীদের জীবনী। তাঁরাও বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন; কখনও কখনও তার চেয়েও বড় সংকটে পড়েছেন। তাদের মনেও হতাশা কাজ করেছে, কিন্তু তারা জানতেন, আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী।

গবেষণায় দেখা গেছে, চরম সংকটে প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। যারা বিশ্বাসের আশ্রয় নেয়, তাদের মানসিক পুনরুদ্ধারের গতি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি (Koenig, H. G. et al., 2012, Handbook of Religion and Health, Oxford University Press, নিউ ইয়র্ক)। কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, নবীরা বিপদে তিনটি কাজ করতেন: আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফেরা, নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করা এবং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখা। এই তিনটি কাজই বিপদ থেকে উত্তরণের মূলমন্ত্র।

কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, নবী ইউনুস (আ.) তিন স্তরের অন্ধকারে—সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার ও মাছের পেটের অন্ধকারে—এই দোয়া পড়েছিলেন: “তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)। এই দোয়ায় তিনি আল্লাহর একত্ব স্বীকার করেছেন, বিপদের মধ্যেও তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং নিজের ভুল স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করেছেন। আল্লাহ তখন তার দোয়া কবুল করেন এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে মুসলিম ইউনুস (আ.)-এর এই দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করবেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫০৫)।

নবী আইয়ুব (আ.) দীর্ঘকাল রোগে ভুগেছেন, কাছের মানুষজন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর দোয়ায় কোনো অভিযোগ ছিল না: “আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে এবং তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)। তিনি অভিযোগের পরিবর্তে প্রশংসা করেছেন, হতাশার বিপরীতে ভরসা রেখেছেন। আমরাও এভাবে সরল ভাষায় বলতে পারি: হে আল্লাহ, আমি কষ্টে আছি, তুমি ছাড়া আমাকে দেখার কেউ নেই।

নবী মুসা (আ.) ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মিসর ছেড়ে অচেনা শহরে একাকী, নিঃস্ব অবস্থায় ঘুরছিলেন। তখন তিনি আল্লাহকে ডাকলেন: “হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী” (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪)। কোরআনে ‘ফাক্বির’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ মুখাপেক্ষী, নির্ভরশীল। এই দোয়ার পরই আল্লাহ তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিলেন এবং সব সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন।

নবী জাকারিয়া (আ.) বৃদ্ধ বয়সে নিঃসন্তান, স্ত্রী বন্ধ্যা। মানবিক দৃষ্টিতে সন্তানলাভের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তিনি আল্লাহকে ডাকলেন: “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একা রেখো না এবং তুমিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯)। এই দোয়ায় কোনো জোরাজুরি বা শর্ত নেই; শুধু একটি আকুতি। জবাবে আল্লাহ তাঁকে নবী ইয়াহইয়াকে উপহার দিয়েছিলেন।

আল্লাহ সুরা বাকারায় মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন: “ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)। নবীদের দোয়াগুলোতে একটি সাধারণ মিল দেখা যায়: তারা কেউ দীর্ঘ আরজি করেননি, নিজের যোগ্যতা উল্লেখ করে জোরজবরদস্তি করেননি। তারা শুধু নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা স্বীকার করেছেন।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ এলে শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। বিপদ এলে সবর করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর। এই বৈশিষ্ট্য শুধু মুমিনের জন্যই” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)। যদি এই মুহূর্তে আপনার জীবনে বিপদ থাকে, তবে ওজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। তারপর হাত তুলে আপনার মনের কথা সরল ভাষায় আল্লাহর কাছে বলুন। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করুন। দেখবেন, আল্লাহ যেভাবে নবীদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, সেভাবে আপনার ডাকেও সাড়া দেবেন।