আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। গত সোমবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসি ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রচারণা শুরুর ঘোষণা দেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে রুবিও অভিযোগ করেন, এই আদালত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাজে বাধা সৃষ্টি করছে এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য এটি হুমকিস্বরূপ। একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি সতর্ক করে বলেন, নিষ্ক্রিয় থাকলে মার্কিন সীমান্ত টহল বাহিনীর সদস্য ও নির্বাচিত নেতাদের বিদেশি বিচারকদের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে। এমনকি নিজেদের দেশ রক্ষার অপরাধে তাঁদের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় মামলা ও কারাদণ্ডের ঝুঁকি থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র দপ্তরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্যান্য দেশকে আইসিসি ত্যাগ করতে চাপ দেওয়া হবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল কিন্তু আইসিসির কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করতে রাজি নয়, তারা আরও কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে। সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক তিন বিশেষজ্ঞ রুবিওর বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথের মতে, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের ওপর বিচারিক এখতিয়ার দাবি করছে না। তিনি বলেন, রুবিও মূলত জাতীয় সার্বভৌমত্বের আড়ালে যুদ্ধাপরাধে দায়মুক্তির প্রচেষ্টা করছেন। অপর রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে আইসিসির শরণাপন্ন হওয়ার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিসি কেবল সেসব দেশে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করতে পারে যে সব দেশ রোম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ২০০২ সালে এ চুক্তির মাধ্যমেই আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো এ চুক্তি অনুমোদন করেনি এবং দেশটির ভূখণ্ডে সংঘটিত কোনো অপরাধ নিয়েও আইসিসি কোনো তদন্ত শুরু করেনি। কৌশলগত কারণে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনে রাশিয়ার কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্তে আইসিসির পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ও আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাসদস্যদের কার্যকলাপ নিয়ে তদন্ত শুরু করায় আইসিসির প্রতি নেতিবাচক অবস্থান নেয় প্রশাসনটি।

দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার ছয় সপ্তাহের মাথায় আইসিসির কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খান, তাঁর দুই উপপ্রধান এবং ছয়জন বিচারকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৫ সালে এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ানো হয়। সে সময় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেসকা আলবানিজ এবং তিনটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

রুবিওর আইসিসি ভেঙে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি আইসিসির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও আদালতের বিলুপ্তি ঘটানো আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া।