পাঞ্জাবের মানবাধিকারকর্মী জসওয়ন্ত সিং খালরার রহস্যজনক অপহরণ এবং পুলিশি রাষ্ট্রব্যবস্থার নৃশংস বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত ছবি ‘সাতলুজ’ ভারতের চলচ্চিত্র জগতে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে। হানি ত্রেহান পরিচালিত এই ছবিটি প্রথমে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ নামে পরিচিত ছিল। ২০২৩ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে এটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপর ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র অনুমোদন পর্ষদ (সিবিএফসি) টানা তিন বছর ছবিটিকে আটকে রাখে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নাগরিক আন্দোলনের মূল্য নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাটিতে বোর্ড প্রায় ১২০টি জায়গায় কাটছাঁটের নির্দেশ দিয়েছিল। পরিচালক হানি ত্রেহান এ সময় ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর আয়োজন, সাক্ষাৎকার এবং সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

ছবিটি শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির সুযোগ না পেয়ে নীরবে একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায়। ৪ জুলাই জি৫-এ মুক্তি পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পরেই সরকারি চাপে প্ল্যাটফর্মটি সিনেমাটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা ছবিটিকে আরও বেশি আলোচিত ও প্রশংসিত করেছে। ‘সাতলুজ’ এমন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক চলচ্চিত্র যা কোনো আপস করে না। রাষ্ট্র ও তার পুলিশ বাহিনী যখন জনগণের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে সেই অধিকার পদদলিত করে, তখন যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, ছবিটি নির্ভীকভাবে সেই বাস্তবতাই সামনে নিয়ে আসে।

১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অমৃতসরে নিজের বাড়ির সামনে থেকে অপহৃত হন জসওয়ন্ত সিং খালরা। এরপর তাঁকে আর কখনো জীবিত বা মৃত অবস্থায় দেখা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শী থাকা সত্ত্বেও এবং জনমত ক্রমেই তীব্র হওয়া সত্ত্বেও প্রায় এক বছর কেটে গেলেও ঘটনার কোনো অগ্রগতি হয়নি। পুলিশের দাবি ছিল, তিনি ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় দিনমজুরের কাজ করতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছবিটি সেই সব হাজারো তরুণের কথাও বলে, যাঁদের ‘নিখোঁজ’ দেখিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার করা হয়েছিল। খালরা নিজেও তাঁদের ন্যায়বিচারের জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন হানি ত্রেহান, নিরেন ভাট ও উৎসব মৈত্র। আরএসভিপি এবং ম্যাকগাফিন পিকচার্স প্রযোজিত এই ছবিতে বাস্তব ঘটনা থেকে বিচ্যুতি বলতে মূলত কয়েকটি চরিত্রের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। ডিজিপি আইপিএস বিট্টা চরিত্রে কানওয়ালজিৎ সিং এবং মুখ্যমন্ত্রী অনন্ত সিং চরিত্রের বাস্তব প্রেরণা সহজেই অনুমেয়। ব্যাংক কর্মকর্তা জসওয়ন্ত সিং খালরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তিনি প্রথম সন্দেহ করেন যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বন্ধুর মা নিখোঁজ হয়ে যান। থানায় অভিযোগ করতে গেলে পদোন্নতির চিন্তায় ব্যস্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর খালরা মর্গে গিয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে স্তম্ভিত করা তথ্য পান এবং শ্মশানে গিয়ে শত শত অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের তালিকা দেখতে পান।

হুমকি ও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে খালরা সত্য অনুসন্ধান চালিয়ে যান। স্থানীয় এক বিধায়ক তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি তোলার জন্য তিরস্কার করলেও তিনি দমে যান না। স্ত্রী পরমজিৎ (গীতিকা বিদ্যা ওহলিয়ান) জানতেন এই পথ তাঁদের দুই স্কুলপড়ুয়া সন্তানসহ পুরো পরিবারকে বিপদের মুখে ফেলছে, তবু তিনি স্বামীর পাশে থাকেন। থানায় কর্মরত খালরার শৈশবের বন্ধু কনস্টেবল সতনাম সিং (সৌরভ সচদেবা) নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খালরাকে জানাতে থাকেন। সতনামের একটি সংলাপ—‘কালো পাতায় লেখা কালো সত্য, যা দেখা যায় না, পড়াও যায় না’—ছবির মূল সুরটি ধরে রাখে।

ছবির প্রায় এক ঘণ্টা পর সতনামের বাড়িতে ঘটে যাওয়া একটি দৃশ্য চলচ্চিত্রটির অন্যতম সেরা মুহূর্ত। এই দৃশ্যে এসএসপি সুরজিৎ সিং সুগ্গা চরিত্রে সুবিন্দর ভিকি এবং সৌরভ সচদেবা অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন। ক্ষমতা ও অহংকারে উন্মত্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা একটি পরিবারকে কার্যত জিম্মি করে রাখে, অন্যদিকে নিচের সারির এক অসহায় পুলিশ সদস্য অপরাধবোধ আর ভয়ে কাঁপতে থাকেন। কে ইউ মোহাননের ক্যামেরা এবং এ শ্রীকর প্রসাদের সম্পাদনা দৃশ্যটিকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

ছবিটি মূলত পুলিশ ও জঙ্গিদের সংঘাতের গল্প হলেও শেষ পর্যন্ত দেখায় পুলিশই কীভাবে সবচেয়ে ভয়ংকর সহিংস শক্তিতে পরিণত হয় এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তি নিয়ে আইন ভঙ্গ করতে থাকে। এটি গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে এক সতর্কবার্তা। খালরা নিখোঁজ হওয়ার পর দিল্লি থেকে পাঞ্জাবে আসেন সিবিআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালক সমুদ্র সিং (অর্জুন রামপাল), যিনি ছবির বর্ণনাকারীর ভূমিকাও পালন করেন। অন্যদিকে একজন আইনজীবী (বরুণ বাদোলা) অবৈধভাবে হত্যা করা মানুষদের পরিবারের পক্ষে আদালতে মামলা করেন।

অভিনয়ের দিক থেকে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় দিলজিৎ দোসাঞ্জের কথা। অতিরঞ্জন ছাড়াই তিনি ক্ষোভ, দৃঢ়তা এবং অদৃশ্য বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারকাসুলভ উপস্থিতিকে সামনে না এনে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে চরিত্র ও সময়ের ভেতর মিশিয়ে দিয়েছেন। সুবিন্দর ভিকি অভিনীত দুর্নীতিগ্রস্ত, ঘৃণ্য ও নির্মম এসএসপি সুগ্গা চরিত্রটি অনেকটা ‘ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস’-এর হান্স লান্ডার কথা মনে করিয়ে দেয়।

হানি ত্রেহান দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশি ব্যবস্থার নৃশংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে ক্যামেরা সরিয়ে নেন না। তবে তিনি এটাও দেখান যে এই পচন পুরো ব্যবস্থার নয়, বরং কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের ঊর্ধ্বতনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, ত্রেহান এই ভয়াবহ গল্পটি অসাধারণ সংযম ও স্থিরতার সঙ্গে বলেছেন। জসওয়ন্ত কোনো আবেগপ্রবণ বিপ্লবী নন, তিনি এই মাটিরই মানুষ। নিজের সমাজকে রক্ষা করার দায় থেকেই তিনি সত্যের খোঁজে নামেন।

‘সাতলুজ’ দেখিয়ে দেয়, বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সত্য উদঘাটনকারীদের অপদস্থ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করে। এটি শুধু ভুলে যাওয়া মানুষদের স্মৃতির দলিল নয়, এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে ধরা এক জরুরি আয়না। তাই ছবিটি শুধু সিনেমা হিসেবে নয়, সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবেও মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে। ছবির কিছু সংলাপ শেষ হওয়ার পরও মনে থেকে যায়। খালরা বলেন, ‘আমরা পুলিশবিরোধী নই, সরকারবিরোধীও নই।’ ছবির শেষ হয় খালরার আরেকটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে, ‘আমি অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাই।’ তবে সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে খালরার বলা সহজ কথাটি—‘কাউকে না কাউকে তো সামনে আসতেই হবে।’